সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পবিত্র দুই মসজিদের নিরাপত্তায় কোনো আপস নয়, সৌদি আরবের পাশে পাকিস্তান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:২৫ পিএম

পবিত্র দুই মসজিদের নিরাপত্তায় কোনো আপস নয়, সৌদি আরবের পাশে পাকিস্তান
ছবি : DAWN

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং নিরাপত্তার নানা ধরনের হুমকির প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং পবিত্র দুই মসজিদ বা হারামাইনের নিরাপত্তার প্রশ্নে নিজেদের অনড় ও সুস্পষ্ট অবস্থানের কথা পুনরায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছে পাকিস্তান।

 

ইসলামি প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছে যে, সৌদি আরবের জাতীয় প্রতিরক্ষা এবং সার্বিক নিরাপত্তায় তারা অতীতেও যেমন সব ধরনের প্রয়োজনীয় সামরিক ও কৌশলগত সহায়তা প্রদান করেছে, ভবিষ্যতেও মিত্র দেশের পাশে থেকে সেই সহায়তার ধারা অব্যাহত রাখবে।

 

এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাটি প্রদান করেছেন পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী।

 

মূলত আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার এই চরম সংকটময় মুহূর্তে পাকিস্তানের মতো একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার এমন দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

 

সম্প্রতি স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিপেনডেন্ট অ্যারাবিয়া’-কে দেওয়া একটি অত্যন্ত বিশদ ও একান্ত সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের মহাপরিচালক দুই দেশের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক এবং কৌশলগত সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।

 

উক্ত সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন যে, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, তাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং সর্বোপরি পবিত্র মক্কা ও মদিনা শরিফের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নীতি এবং সাধারণ জনগণের আবেগ ও বিশ্বাসের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

 

এই পবিত্র ভূমিগুলোর নিরাপত্তার প্রশ্নে বিন্দুমাত্র আপস করার কোনো সুযোগ পাকিস্তানের নেই বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো মূল্যে সৌদি আরবের পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করাকে ইসলামাবাদ নিজেদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এবং এই নীতি থেকে তারা কখনোই পিছপা হবে না।

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের লাগাতার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে সৌদি আরব এক নজিরবিহীন জাতীয় নিরাপত্তা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মিত্র দেশ সৌদি আরবকে পাকিস্তান ঠিক কী ধরনের এবং কতটুকু সামরিক সহায়তা প্রদান করছে, এমন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রশ্নের মুখোমুখি হন লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী।

 

আন্তর্জাতিক সামরিক কূটনীতির রীতিনীতি এবং জোটগত বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে এই প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি জানান, কৌশলগত সামরিক জোটগুলোর ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে সামরিক সহায়তার ধরন, প্রকৃতি কিংবা সুনির্দিষ্ট পরিমাণ প্রকাশ করা কখনোই প্রচলিত রীতি নয়।

 

এটি সামরিক গোপনীয়তা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই সর্বদা গোপন রাখা হয়। তবে তিনি এটুকু নিশ্চিত করেন যে, যখনই সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের হুমকি তৈরি হয়েছে, পাকিস্তান তার সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে ভ্রাতৃপ্রতিম এই দেশটির পাশে দাঁড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় তারা একইভাবে সৌদি আরবের পাশে পাহাড়ের মতো অবিচল থাকবে।

 

সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোট’ নিয়েও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন এই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা। পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের মতো মুসলিম বিশ্বের তিনটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী দেশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই ত্রিদেশীয় সামরিক জোটের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ধরনের জল্পনাকল্পনা রয়েছে।

 

এই বিষয়ে সব ধরনের ধোঁয়াশা দূর করে তিনি স্পষ্ট করে জানান যে, এই জোটটি সম্পূর্ণভাবে একটি প্রতিরক্ষামূলক সামরিক বোঝাপড়া। এর পেছনে কোনো দেশের ওপর আগ্রাসন চালানো বা আক্রমণাত্মক কোনো সামরিক উদ্দেশ্য লুকিয়ে নেই।

 

বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং জোটভুক্ত দেশগুলোর জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে সতর্ক করে দেন যে, যদি এই জোটভুক্ত কোনো সদস্য দেশের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয় অথবা তাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানার চেষ্টা করা হয়, তবে তিনটি দেশ সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধভাবে সেই আগ্রাসনের অত্যন্ত কঠোর এবং মোক্ষম জবাব প্রদান করবে।

 

বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে ইরানের ভূমিকা এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অত্যন্ত জটিল একটি আকার ধারণ করেছে। এই সংবেদনশীল ইস্যুতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থান জানতে চাওয়া হলে আইএসপিআর মহাপরিচালক অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ এবং গঠনমূলক একটি উত্তর প্রদান করেন।

 

তিনি জানান, পাকিস্তান কখনোই এই অঞ্চলে সংঘাত বা যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ুক, তা প্রত্যাশা করে না। বরং আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমিত করতে এবং সব পক্ষের মধ্যে সর্বোচ্চ সংযম বজায় রাখতে পাকিস্তান ইতিমধ্যেই ইরানসহ সংশ্লিষ্ট সব দেশের সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।

 

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তাদের গঠিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোট কখনোই নির্দিষ্ট কোনো দেশকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে বা কাউকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়নি। এই জোটের একমাত্র এবং অভিন্ন লক্ষ্য হলো সমগ্র অঞ্চলে একটি টেকসই শান্তি, সুদৃঢ় স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যা প্রকারান্তরে সমগ্র বিশ্বের শান্তির জন্যই অত্যন্ত অপরিহার্য।

 

এই একান্ত সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে এসে মুসলিম উম্মাহর প্রতি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জোরালো আহ্বান জানান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী। তিনি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং পারস্পরিক সংঘাত বাড়িয়ে কখনোই কোনো পক্ষের দীর্ঘমেয়াদি লাভ বা স্বার্থ হাসিল হতে পারে না।

 

বরং এই ধরনের সংঘাত কেবল পুরো অঞ্চলকে ধ্বংস এবং অস্থিতিশীলতার দিকেই ধাবিত করে। মুসলিম বিশ্বের নেতাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত পরিহার করে নিজেদের মধ্যে এই হামলার সংস্কৃতি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

 

যেকোনো ধরনের মতবিরোধ বা সংকট সমাধানে আলোচনার টেবিলে বসা এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখার ওপর তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি এই বাস্তবতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে, যদি শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে কোনো যৌক্তিক ও সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছানো একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং জোটভুক্ত কোনো দেশের ওপর আক্রমণ নেমে আসে, তখন মক্কা জোটের এই সম্মিলিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তাদের নিজ নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকরী ও চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করবে।

 

সার্বিকভাবে, পাকিস্তানের এই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান টালমাটাল ভূরাজনীতিতে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে যেমন এটি সৌদি আরবের জন্য একটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক স্বস্তির বার্তা বহন করছে, অন্যদিকে তেমনি এটি হুথি বিদ্রোহী বা অন্য যেকোনো আগ্রাসী পক্ষের জন্য একটি প্রচ্ছন্ন কিন্তু কঠোর সতর্কবার্তাও বটে।

 

একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের যে কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা পাকিস্তান জানিয়েছে, তা এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

 

পবিত্র হারামাইনের সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষায় পাকিস্তানের এই অটল অঙ্গীকার মূলত মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর ঐক্যেরই একটি শক্তিশালী প্রতিফলন, যা আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে।

 

- ডন