ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা উসকানির দাঁতভাঙা জবাব দিতে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী অতীতের ১২ দিন কিংবা ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের চেয়েও বহুগুণ ধ্বংসাত্মক ও অপ্রতিরোধ্য সামরিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে রেখেছে।
তাঁর মতে, বৈরী শক্তিগুলো যদি নতুন করে কোনো হটকারী সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তাদের এমন এক নজিরবিহীন সামরিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, যার তীব্রতা ও কৌশল সম্পর্কে ওয়াশিংটন বা তার মিত্রদের কোনো ধারণাই নেই।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম পার্সটুডে জানিয়েছে, রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক তাৎপর্যপূর্ণ বার্তায় দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রভাবশালী এই শীর্ষ কর্মকর্তা ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক হুমকির সরাসরি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি তাঁর বার্তায় উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের লাগাতার হুমকি-ধমকি এবং উসকানিমূলক রাজনৈতিক বক্তব্য কোনোভাবেই রণক্ষেত্রের প্রকৃত ভারসাম্য ও বাস্তবতাকে পরিবর্তন করতে পারবে না।
তিনি মনে করেন, পশ্চিমা প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে ইরানকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থ সুরক্ষার অবস্থান থেকে একচুলও নড়ানো সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক টানাপোড়েনের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় এই ইরানি সমরনায়কের প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও কূটনীতিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
জেনারেল রেজায়ি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তাদের প্রস্তুতি কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং সম্ভাব্য যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য সম্পূর্ণ কার্যকর একটি প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক কাঠামো গড়ে তুলেছে।
তিনি বিশেষভাবে অতীতের ১২ ও ৪০ দিনের সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক সামরিক ইতিহাসে অত্যন্ত স্মরণীয় ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত হিসেবে বিবেচিত। তাঁর মতে, সেই সংঘাতগুলো যদি প্রতিপক্ষের কাছে বিধ্বংসী মনে হয়ে থাকে, তবে আগামীতে ইরানের তরফ থেকে আসা পাল্টা আঘাত হবে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী, সুদূরপ্রসারী এবং হিসাবের বাইরে।
শত্রুপক্ষের যেকোনো দুঃসাহসিক সামরিক অভিযানের জবাবে প্রস্তুত রাখা এই নতুন কৌশল কেবল সীমানা সুরক্ষাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা আগ্রাসী শক্তির সমগ্র সামরিক অবকাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুগুলোকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবের এই সতর্কবার্তার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও ভীতিকর দিকটি ছিল সমরাস্ত্রের ব্যবহার এবং যুদ্ধকৌশলের ধরন সংক্রান্ত তাঁর ইঙ্গিত। রেজায়ি খোলাখুলিভাবে জানান, ইরানের সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযান কোনো প্রচলিত বা পরিচিত নিয়মকানুন অনুসরণ করে পরিচালিত হবে না।
তিনি উল্লেখ করেন, বৈরী পরাশক্তিগুলো যেসব সামরিক নিয়মকানুন ও কৌশলগত প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আগাম ধারণা পোষণ করে এবং যেগুলোর ওপর ভিত্তি করে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি সাজায়, ইরানের নতুন রণকৌশল তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির হবে।
আধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণে তৈরি নতুন ধরনের সামরিক কৌশল এবং অপ্রত্যাশিত আঘাতের রূপরেখা ইতিমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে, যা যুদ্ধক্ষেত্রের প্রচলিত সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
এর মাধ্যমে তিনি মূলত ওয়াশিংটনকে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, যেকোনো অগ্রিম ধারণার ওপর ভিত্তি করে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা হবে এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল, হরমুজ প্রণালি এবং সংলগ্ন ভূখণ্ডে যে বহুমুখী সংঘাত ও স্নায়ুযুদ্ধ চলমান রয়েছে, রেজায়ির এই কড়া বক্তব্য তারই একটি প্রত্যক্ষ প্রতিফলন।
বিশেষ করে তেল পরিবহন, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক অচলাবস্থা যখন বারবার সামরিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হচ্ছে, তখন এ ধরনের বার্তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।
ওয়াশিংটন ও তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে সামরিক প্রতিরোধ ও বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। অন্যদিকে তেহরান তাদের নিজস্ব ড্রোন প্রযুক্তি, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলেছে।
মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি কেবল ইরানের একজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাই নন, বরং তিনি দীর্ঘকাল ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেশটির প্রতিরক্ষা নীতিনির্ধারণে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।
ফলে তাঁর দেওয়া এই সতর্কবার্তাকে কেবল একটি নিয়মিত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন না সমরবিশারদেরা। তাদের অভিমত, এর মধ্য দিয়ে ইরান মূলত নিজেদের সামরিক প্রস্তুতির সর্বোচ্চ স্তরটি আন্তর্জাতিক মহলের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করল।
একই সঙ্গে যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতের দায়ভার সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তেহরান এই বার্তা দিল যে, আগ্রাসনের কোনো পুনরাবৃত্তি ঘটলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এমন এক গভীর সংকটের দিকে ধাবিত হবে, যার নিয়ন্ত্রণ পরাশক্তিগুলোর নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, এই কড়া সতর্কবার্তা সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে আরও একবার স্পষ্ট করে দিল যে, আলোচনা ও পারস্পরিক সমঝোতা ছাড়া শক্তির প্রদর্শনী কেবল বৃহত্তর ধ্বংসযজ্ঞকেই ত্বরান্বিত করবে।