রবিবার, অক্টোবর ১৮, ২০২৬
৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বোমার নাম ‘মা’ রাখা পশ্চিমা বর্বরতার চরম দৃষ্টান্ত: আইআরজিসি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:১১ পিএম

বোমার নাম ‘মা’ রাখা পশ্চিমা বর্বরতার চরম দৃষ্টান্ত: আইআরজিসি
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে সামরিক আধিপত্য বিস্তার এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতার পাশাপাশি এক নতুন আদর্শিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংঘাতের মাত্রা যুক্ত হয়েছে। আধুনিক সমরাস্ত্রের নামকরণের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত পরিভাষা নিয়ে তীব্র এবং তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি।

 

পশ্চিমা সামরিক পরিভাষায় পৃথিবীর অন্যতম ধ্বংসাত্মক ও প্রাণঘাতী একটি বোমার নামকরণে ‘মা’ বা মাদার-এর মতো একটি অত্যন্ত পবিত্র, আবেগপূর্ণ এবং সৃষ্টিকামী শব্দ ব্যবহার করার ঘটনাকে একটি সভ্যতার চরম বর্বরতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং অমানবিক দৃষ্টিভঙ্গির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ইরান।

 

এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের নেশায় উন্মত্ত পরাশক্তিগুলো ভাষার পবিত্রতা ও মানবিক মূল্যবোধকেও চরমভাবে পদদলিত করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। সম্প্রতি ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এবং শীর্ষস্থানীয় সংবাদ সংস্থা পার্সটুডের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে যে, আইআরজিসির মুখপাত্র এবং উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ ও তাত্পর্যপূর্ণ পোস্টে এই মন্তব্য করেছেন।

 

তার এই বিবৃতিটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক নজিরবিহীন সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ইরানের আদর্শিক লড়াই এক নতুন মোড় নিয়েছে।

 

জেনারেল মোহেব্বি তার বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, একটি সুস্থ ও মানবিক সভ্যতা কখনোই ধ্বংসের প্রতীকের সঙ্গে সৃষ্টির প্রতীকের সংমিশ্রণ ঘটাতে পারে না। তিনি বলেন, যে সভ্যতা তার সবচেয়ে শক্তিশালী, ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক বোমার নামকরণে ‘মা’-এর মতো পবিত্র শব্দ ব্যবহার করতে পারে, সেটি কোনোভাবেই কোনো সভ্য সমাজ হতে পারে না; বরং সেটি কেবল একটি বর্বর, নিষ্ঠুর ও অমানবিক সভ্যতাই হতে পারে।

 

সামরিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, জেনারেল মোহেব্বির এই তীক্ষ্ণ সমালোচনার মূল লক্ষ্যবস্তু হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কর্তৃক তৈরি করা ‘জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট’ নামক সুবিশাল ও প্রকাণ্ড বোমাটি, যা আন্তর্জাতিক সামরিক পরিমণ্ডলে এবং পশ্চিমা গণমাধ্যমে ‘মাদার অব অল বোম্বস’ বা ‘সব বোমার মা’ হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত।

 

আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে, ২০১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস বা ইসলামিক স্টেটের একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো এই দানবীয় বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল।

 

এই বোমাটি পারমাণবিক অস্ত্রের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত বোমা হিসেবে বিবেচিত। একটি ভয়ংকর মারণাস্ত্রের সাথে পৃথিবীর সবচেয়ে স্নেহময়ী, সৃষ্টিকারী এবং রক্ষাকারী সত্তা ‘মা’-এর তুলনা করাকে প্রাচ্যের সংস্কৃতি ও ইসলামি মূল্যবোধের ওপর এক চরম আঘাত হিসেবেই দেখছে ইরান।

 

জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি তার বিবৃতিতে শুধুমাত্র পশ্চিমা সামরিক নামকরণের অমানবিক দিকটিই তুলে ধরেননি, বরং তিনি ইরানের আপামর জনসাধারণের অদম্য মানসিক শক্তি, আত্মবিশ্বাস এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তার দিকটিও বিশ্ববাসীর সামনে অত্যন্ত গর্বের সাথে উপস্থাপন করেছেন।

 

শত্রুর যেকোনো ভয়ংকর মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক চাপ মোকাবিলায় ইরানি জাতির ঐতিহাসিক সক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি তার ওই পোস্টে আরও লেখেন, ভবিষ্যৎ আসলে সেই অকুতোভয় জাতির হাতেই সুরক্ষিত, যারা শত্রুর সবচেয়ে বড় এবং ভয়ংকর হুমকিকেও নিজেদের অদম্য সাহস দিয়ে পাড়া-মহল্লার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন হাসি-ঠাট্টা ও উপহাসের বিষয়ে পরিণত করতে পারে।

 

তার এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, পরাশক্তিগুলো তাদের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র এবং ভয়ংকর সব বোমার নাম দিয়ে বিশ্ববাসীকে আতঙ্কিত করার যে অপচেষ্টা চালিয়ে থাকে, ইরানের সাধারণ মানুষের কাছে তা কেবলই এক হাস্যকর এবং দুর্বল মানসিকতার পরিচায়ক।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইআরজিসি মুখপাত্রের এই বিবৃতিটি কেবল একটি সাধারণ সামরিক প্রতিক্রিয়া নয়; এটি মূলত পশ্চিমা বিশ্ব এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী আদর্শিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের একটি অত্যন্ত স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।

 

প্রাচ্যের সমাজব্যবস্থায়, বিশেষ করে ইসলামি সংস্কৃতিতে ‘মা’ শব্দটি সর্বোচ্চ সম্মান, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, অসীম মমতা এবং নতুন প্রাণের সৃষ্টির প্রতীক। পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মে এবং সংস্কৃতিতে মাকে স্রষ্টার পরেই সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে।

 

এমন একটি পরম শ্রদ্ধেয় ও পবিত্র শব্দকে যখন পশ্চিমা সামরিক বাহিনী ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা, রক্তপাত এবং মানবতা লুণ্ঠনের একটি যান্ত্রিক উপাদানের সাথে যুক্ত করে, তখন তা কেবল ভাষাগত বিকৃতিই নয়, বরং এটি তাদের সামগ্রিক মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কেই নির্দেশ করে।

 

আইআরজিসির মতে, একটি মারণাস্ত্রের নাম ‘মা’ রাখা মূলত নারীসত্তা এবং মাতৃসত্তার প্রতি এক চরম অবমাননা। আধুনিক যুগে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘাত কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা গণমাধ্যম, ভাষা এবং মনস্তত্ত্বের জগতেও গভীরভাবে প্রবেশ করেছে।

 

পরাশক্তিগুলো সুকৌশলে তাদের সামরিক আগ্রাসনকে বৈধতা দিতে বা সাধারণ মানুষের কাছে এর ভয়াবহতা আড়াল করতে এমন সব ভাষা ব্যবহার করে, যা আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ বা মহিমান্বিত মনে হয়। কিন্তু ইরান এই ভাষাগত আধিপত্যবাদের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে।

 

তাদের দাবি, অস্ত্রের নামকরণে পারিবারিক বা পবিত্র সম্পর্কের উল্লেখ করাটা পশ্চিমা সামরিক নীতিনির্ধারকদের এক ধরনের বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডকে মহিমান্বিত করার এক ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আইআরজিসির এই বক্তব্য মূলত সেই ভাষাগত ও মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধেই একটি জোরালো প্রতিবাদ।

 

বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত সংবেদনশীল ও উত্তপ্ত। মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন পরাশক্তির প্রক্সি যুদ্ধ, সরাসরি সংঘাত এবং স্নায়ুযুদ্ধ প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রূপ ধারণ করছে। এই পরিস্থিতিতে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 

যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলো প্রতিনিয়ত তাদের অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তির প্রদর্শনী এবং ভীতিকর নামকরণের মাধ্যমে তাদের প্রতিপক্ষ দেশগুলোর ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করার কৌশল অবলম্বন করে থাকে।

 

অপরদিকে ইরান, যারা দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক হুমকির মধ্যে টিকে আছে, তারা এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপকে নিজেদের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার কৌশল বেছে নিয়েছে।

 

জেনারেল মোহেব্বির এই বিবৃতি সেই প্রতিরোধ কৌশলেরই একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অংশ, যা দেশের সাধারণ নাগরিকদের মনোবল চাঙ্গা রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পশ্চিমা বিশ্বের নৈতিক দ্বৈততা সম্পর্কে সচেতন করার একটি সুপরিকল্পিত প্রয়াস।

 

পরিশেষে এটি বলা যায় যে, বোমার নামকরণের মতো আপাতদৃষ্টিতে একটি সাধারণ সামরিক বিষয়কে কেন্দ্র করে আইআরজিসির এই তীব্র এবং যৌক্তিক সমালোচনা আন্তর্জাতিক মহলে একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 

এটি বিশ্ববাসীকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে যে, আধুনিক যুগে মানবতা, নৈতিকতা এবং সভ্যতার প্রকৃত সংজ্ঞা আসলে কী। সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের উন্মাদনায় পরাশক্তিগুলো কি তাদের ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধ এবং ভাষার পবিত্রতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে?

 

ধ্বংসের হাতিয়ারকে সৃষ্টির প্রতীকের সাথে মিলিয়ে ফেলার এই যে পশ্চিমা প্রবণতা, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন বার্তা বহন করে আনছে, তা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার দ্বার উন্মোচন করেছে ইরানের এই বক্তব্য। এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করেছে যে, যুদ্ধ কেবল রণক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি ভাষা, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধের জগতেও এক নিরন্তর লড়াই হিসেবে চলমান থাকে।

 

- পার্সটুডে