শনিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২৬
২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদিতে হামলায় হুথিদের আধুনিক অস্ত্র ও কৌশলগত গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম

সৌদিতে হামলায় হুথিদের আধুনিক অস্ত্র ও কৌশলগত গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে ইরান
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর জন্য ইরান সরাসরি আধুনিক অস্ত্র ও নিবিড় কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে।

 

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল তাদের এক বিস্তারিত ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমটির ওই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তেহরান কেবল অস্ত্র সরবরাহ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, বরং সৌদি আরবের ঠিক কোন কোন স্থানে এবং কোন ধরনের সামরিক বা বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে হবে, সে বিষয়েও পুঙ্খানুপুঙ্খ গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে হুথিদের সরাসরি পরিচালিত করছে।

 

এই আধুনিক সমরাস্ত্র এবং নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই হুথি বিদ্রোহীরা সম্প্রতি তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও মানববিহীন ড্রোন ব্যবহার করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে, যা সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য এক বড় ধরনের হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক এই সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ইরানের কাছ থেকে প্রাপ্ত এই অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম এবং লজিস্টিক সহায়তার কারণে ইয়েমেনের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

 

এর ফলে তারা এখন সৌদি আরবের অভ্যন্তরে এবং ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর ওপর অনেক বেশি নিখুঁত ও প্রাণঘাতী হামলা চালাতে সক্ষম হচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পক্ষে স্বাধীনভাবে এ ধরনের উচ্চ প্রযুক্তির সমরাস্ত্র ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব।

 

কিন্তু পর্দার আড়াল থেকে ইরানের প্রত্যক্ষ সহায়তার কারণেই হুথিদের এই সামরিক উত্থান সম্ভব হয়েছে। এই সহায়তার পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক, যার মধ্যে রয়েছে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে দেওয়া, আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান, গোপন গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশলগত নির্দেশনা দেওয়ার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো।

 

ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের এই গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, ইরান এবং হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে এই সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক কোনো আকস্মিক বা সাম্প্রতিক ঘটনা নয়, বরং এটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে।

 

দীর্ঘ এই সময় ধরে ইরান নানা চোরাই পথে ইয়েমেনে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম পাচার করে আসছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং কড়া নজরদারি এড়াতে তেহরান অত্যন্ত অভিনব ও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে।

 

এর মধ্যে অন্যতম হলো সাধারণ মাছ ধরার নৌকায় করে সমুদ্রপথে লুকিয়ে হুথিদের কাছে প্রাণঘাতী এসব অস্ত্র পাঠানো। তবে ইরান কেবল অস্ত্র দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করছে না। ইয়েমেনের মাটিতে বসেই যেন হুথিরা নিজেরাই আধুনিক সমরাস্ত্র তৈরি করতে পারে, সে লক্ষ্যে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ‘বিপ্লবী গার্ড’ বা আইআরজিসি-এর চৌকস সেনারা হুথি যোদ্ধাদের সরাসরি মিসাইল এবং ড্রোন তৈরির হাতে-কলমে শিক্ষা দিচ্ছে।

 

ফলশ্রুতিতে, হুথি বিদ্রোহীরা এখন বহির্বিশ্বের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না থেকে নিজেরাই স্থানীয়ভাবে এই ধরনের ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।

 

আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সামরিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনা এই অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থাকে কিছুটা বাধাগ্রস্ত করেছিল। সংবাদমাধ্যমটি তাদের প্রতিবেদনে আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক তৎপরতা এবং ওই অঞ্চলে তাদের ধারাবাহিক বিমান হামলার কারণে সম্প্রতি হুথিদের কাছে ইরানের অস্ত্র সরবরাহের স্বাভাবিক রুটগুলোতে বেশ বিঘ্ন ঘটেছিল।

 

লোহিত সাগর এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর কড়া পাহারার কারণে মাছ ধরার নৌকা ব্যবহার করে অস্ত্র পাচার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু ইরান এই প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও উন্নত ও গোপনীয় পদ্ধতি গ্রহণ করে।

 

সাধারণ নৌযানের পরিবর্তে তারা পানির নিচ দিয়ে চলাচলকারী সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ ব্যবহার করে অত্যন্ত সন্তর্পণে হুথিদের কাছে ভারী অস্ত্র ও সরঞ্জাম পাঠানো শুরু করে। এটি প্রমাণ করে যে, যেকোনো মূল্যে ইয়েমেনে তাদের মিত্রদের সশস্ত্র রাখার বিষয়ে তেহরান কতটা মরিয়া এবং কৌশলগত দিক থেকে তারা কতটা অগ্রসর।

 

অস্ত্র চোরাচালানের এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার একটি বড় প্রমাণ পাওয়া যায় গত জুলাই মাসের একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা থেকে। ওই সময়ে আন্তর্জাতিক সমস্ত আইন ও রীতিনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আকাশপথে সরাসরি সামরিক সরঞ্জাম ইয়েমেনে স্থানান্তর করা হয়।

 

ইরানের অন্যতম বিতর্কিত বিমান পরিবহন সংস্থা ‘মহান এয়ার’-এর একটি বিশেষ ফ্লাইটে করে হুথি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে সরাসরি ইরানি সামরিক কর্মকর্তা, অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং ড্রোন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বাড়তি যন্ত্রাংশ নিয়ে আসা হয়।

 

বেসামরিক বিমানের আড়ালে সামরিক সরঞ্জাম ও বিশেষজ্ঞদের এই স্থানান্তর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রোন তৈরির এই যন্ত্রাংশগুলো ব্যবহার করে হুথিরা তাদের আকাশপথে হামলার সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে, যার প্রধান লক্ষ্যবস্তু মূলত সৌদি আরবের তেল শোধনাগার, বিমানবন্দর এবং সামরিক ঘাঁটিগুলো।

 

মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী প্রক্সি যুদ্ধ এবং ইরানের এই অব্যাহত ইন্ধন কেবল সৌদি আরব বা ইয়েমেনের জন্যই নয়, বরং গোটা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও এক মারাত্মক হুমকি।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই ইয়েমেন সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে, কিন্তু এ ধরনের সামরিক সহায়তা এবং উস্কানিমূলক পদক্ষেপ সেই শান্তি প্রক্রিয়াকে বারবার ব্যাহত করছে।

 

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ইরান যদি হুথিদের এই অস্ত্র সরবরাহ এবং কৌশলগত সহায়তা প্রদান অবিলম্বে বন্ধ না করে, তবে এই অঞ্চলে একটি সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধ বেধে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে, যার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ এবং সুদূরপ্রসারী।

 

এখন দেখার বিষয়, ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের এই বিস্ফোরক প্রতিবেদনের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসংঘ ইরানের এই বেপরোয়া পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কী ধরনের কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে।

 

- ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল