বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৫, ২০২৬
৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সামরিক হামলা দিয়ে কোনো জাতিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা অসম্ভব - পেজেশকিয়ান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৩৪ পিএম

সামরিক হামলা দিয়ে কোনো জাতিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা অসম্ভব - পেজেশকিয়ান
ছবি : File Photo

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক সংঘাতের এই চরম সংকটময় মুহূর্তে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছেন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে বহুমুখী চাপ এবং হুমকির সম্মুখীন হওয়া এই রাষ্ট্রনেতা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, কেবল আকাশ থেকে বোমা নিক্ষেপ করে কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে বিশ্বের কোনো স্বাধীন দেশ বা আত্মমর্যাদাশীল জনগোষ্ঠীকে কখনোই চিরতরে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায় না।

 

তার মতে, সামরিক আগ্রাসনের চেয়ে অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও অনৈক্য একটি জাতির অস্তিত্বের জন্য অনেক বেশি বিপজ্জনক এবং হুমকিস্বরূপ। বৃহস্পতিবার ইরানের সরকারি ও রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং আধিপত্য বিস্তারের এক অসম ও স্নায়ুক্ষয়ী প্রতিযোগিতা চলছে, ঠিক তখনই ইরানের প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য আধুনিক যুদ্ধকৌশল ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের এক গভীর ও বাস্তবসম্মত দিক উন্মোচন করেছে।

 

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তার সাম্প্রতিক এক আনুষ্ঠানিক ও নীতি-নির্ধারণী বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আধুনিক সমরাস্ত্র কিংবা বোমার স্তূপ কেবল কাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে, কিন্তু তা কখনোই কোনো সচেতন সমাজের চিন্তাধারা, স্বাধীনতা স্পৃহা ও প্রতিরোধের মানসিকতাকে ধ্বংস করতে পারে না।

 

তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে এক গভীর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেন, “আধুনিক বোমা ও ভারী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম সমাজকে কখনোই আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায় না।

 

তবে আমরা যদি নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ি এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য বিনষ্ট হয়ে নিজেদের ভেতরেই রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভেদ তৈরি হয়, ঠিক তখনই শত্রু কোনো প্রকার রক্তপাত ছাড়াই খুব সহজে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হবে।”

 

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি মূলত ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি সুদৃঢ় ও ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন।

 

তিনি তার বক্তব্যে এই বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেশের নাগরিকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, আগামী দিনগুলোতে দেশের সামনে আরও নানাবিধ কঠিন, জটিল ও প্রতিকূল পরিস্থিতি আসতে পারে।

 

বৈশ্বিক অবরোধ, পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সীমান্ত ও আকাশসীমায় সামরিক হুমকির মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমগ্র জাতিকে একতাবদ্ধ হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

 

ভবিষ্যতের এই সম্ভাব্য ও অবশ্যম্ভাবী সংকটগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য জাতীয় সংহতি ও ঐক্য জোরদার করার কার্যকর উপায় খুঁজে বের করতে তিনি দেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারক, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ নাগরিকদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

 

একই সঙ্গে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে সব ধরনের জাতিগত, রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত ভেদাভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিকূলতার মোকাবিলা করার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।

 

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির বর্তমান অবস্থাও এখন অত্যন্ত উত্তপ্ত ও বিস্ফোরণোন্মুখ। এই উত্তেজনার পারদ যে কেবল রাষ্ট্রনেতাদের রাজনৈতিক বক্তৃতা, কড়া বিবৃতি বা হুঁশিয়ারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বাস্তবেও অত্যন্ত ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করেছে, তার একটি বড় ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ হলো হরমুজ প্রণালিতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা।

 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত এই জলপথে বিগত মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে এক রহস্যময় ও ভয়াবহ হামলায় অন্তত দুটি বৃহদাকার কার্গো জাহাজ বা পণ্যবাহী নৌযান সম্পূর্ণরূপে সাগরের বুকে ডুবে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

 

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমা ও স্থলভাগে এখন এক অঘোষিত ও নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই বাণিজ্যিক নৌরুটে, যেখান দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়, সেখানে এমন আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক হামলার ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এক গভীর উদ্বেগ ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে।

 

হরমুজ প্রণালির এই চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণেই মূলত ইরানের প্রেসিডেন্ট তার দেশবাসীকে আসন্ন কঠিন পরিস্থিতি সম্পর্কে আগেভাগেই মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্যের একটি সুস্পষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত দিক রয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইরান পশ্চিমা বিশ্বের নানামুখী অর্থনৈতিক অবরোধ, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সামরিক হুমকির মধ্যে দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছে।

 

এর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন সময়ে নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক পরাশক্তি এবং বিদেশি শত্রুরাষ্ট্রগুলো অনেক সময়ই এই ধরনের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বা রাজনৈতিক বিভেদকে অত্যন্ত সুকৌশলে পুঁজি করে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টা করে থাকে।

 

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান মূলত শত্রুপক্ষের এই চিরাচরিত ও বিভাজনমূলক কৌশলটিকেই অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন। তার মতে, যখন একটি দেশের জনগণ নিজেদের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত হয় এবং একে অপরের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখন বিদেশি শক্তির আর নতুন করে কোনো সামরিক আগ্রাসন, বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না; সমাজ এমনিতেই ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়ে।

 

তাই সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক সংহতি অক্ষুণ্ণ রাখাটাই বর্তমান ইরান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়।

 

বিগত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া এবং ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলে একটি বৃহত্তর ও ধ্বংসাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে।

 

এই চরম সংঘাতময় ও পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে ইরান নিজেকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী নিয়ামক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে দেশের সীমানার বাইরে প্রভাব বিস্তার করার পাশাপাশি দেশের ভেতরের সাধারণ অর্থনীতি, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জনজীবনকে স্বাভাবিক এবং স্বচ্ছন্দ রাখাও তেহরানের জন্য একটি বড় ধরনের পরীক্ষা।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনের শীর্ষস্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো নিয়মিতভাবেই এই অঞ্চলের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, সমরাস্ত্রের মহড়া এবং সম্ভাব্য সংঘাতের খবর অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সম্প্রচার করে চলেছে।

 

এই ক্রমবর্ধমান সামরিক ডামাডোল এবং আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মাঝে ইরানের শীর্ষ নির্বাহীর কাছ থেকে আসা এই ঐক্যের বার্তা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র হিসেবে তারা সামরিক সংঘাতের চেয়েও দেশের অভ্যন্তরীণ নাগরিক ঐক্যকে জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় ও অভেদ্য ঢাল হিসেবে বিবেচনা করছে।

 

পরিশেষে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, একুশ শতকের এই আধুনিক বিশ্বে কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শন করে বা পেশিশক্তির জোরে কোনো জাতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী বিজয় অর্জন করা কিছুতেই সম্ভব নয়।

 

একটি আত্মমর্যাদাশীল দেশের প্রকৃত সামরিক শক্তি তার ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগারে বা আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সেই দেশের সাধারণ মানুষের ইস্পাতকঠিন ঐক্য, পারস্পরিক বিশ্বাস ও অকৃত্রিম দেশপ্রেমের মাঝেই তা গভীরভাবে নিহিত থাকে।

 

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই প্রজ্ঞাপূর্ণ ও দূরদর্শী বক্তব্য কেবল ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের নাগরিকদের জন্যই নয়, বরং বিশ্বের যেকোনো স্বাধীনতাকামী, সার্বভৌম ও আগ্রাসন-প্রতিরোধকারী জাতির জন্যই এক অমোঘ ও সার্বজনীন বার্তা বহন করে।

 

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক কার্গো জাহাজ ডুবে যাওয়ার মতো নৈমিত্তিক অথচ ভয়ংকর সামরিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর অব্যাহত ও ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে দাঁড়িয়ে ইরান ঠিক কীভাবে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংহতি সম্পূর্ণ অটুট রেখে এই বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করে, সেটাই এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের প্রধান পর্যবেক্ষণের বিষয়।

 

আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ যেদিকেই মোড় নিক না কেন, একটি ঐক্যবদ্ধ ও সচেতন সমাজ যে কোনো পারমাণবিক বা প্রচলিত ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী এবং টিকে থাকার দৌড়ে এগিয়ে থাকে, ঠিক সেই চিরন্তন সত্যটিই সমগ্র বিশ্ববাসীর সামনে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।

 

- আল জাজিরা