পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে প্রায়শই দাবি করা হয় যে, কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং ধারাবাহিক যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের অর্থনীতি খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে এবং যেকোনো মুহূর্তে তা সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়তে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচলিত এই বহুল চর্চিত দাবিগুলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, অবাস্তব এবং নিছক কল্পনাপ্রসূত বলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুন নাসের হেম্মাতি।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বার্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানদের সামনে দেওয়া এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী ভাষণে তিনি নিজ দেশের অর্থনৈতিক সহনশীলতা এবং টিকে থাকার অদম্য ক্ষমতার কথা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
ব্যাংককের এই অত্যন্ত সম্মানজনক ও নীতিনির্ধারণী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানকালে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা অত্যন্ত জোরালো ভাষায় উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেওয়া দীর্ঘস্থায়ী ও অন্যায্য যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা ও সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার চরম চাপ সত্ত্বেও ইরানের অর্থনীতি এক অভাবনীয় এবং ঈর্ষণীয় মাত্রার সহনশীলতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত কয়েক দশক ধরে ইরানের ওপর দিয়ে যে পরিমাণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝড় বয়ে গেছে, তা অন্য যেকোনো সাধারণ বা উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশের জন্য সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার ছিল।
কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির মজবুত ভিত্তি এবং নিজস্ব সম্পদের ওপর নির্ভরতার কারণে পশ্চিমা বিশ্বের সেই আকাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক পতনের দৃশ্য কখনোই বাস্তবে রূপ নেয়নি। তাই তাঁর মতে, বিশ্ববাসীর সামনে ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার যে আখ্যান বা গল্প প্রতিনিয়ত প্রচার করা হচ্ছে, তা পুরোপুরি বাস্তবতাবিবর্জিত এবং একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক প্রচারণার অংশমাত্র।
নিজের দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সফল নীতিমালার কথা তুলে ধরতে গিয়ে আব্দুন নাসের হেম্মাতি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চরম বৈরী অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আরোপিত কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বিশেষ করে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যসামগ্রী এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরনের সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে।
এর পাশাপাশি, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইন ঠিক রেখে এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকে উৎসাহিত করে মূল্যস্ফীতির লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেন যে, দেশের আর্থিক খাতে কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখা, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত নীতিগুলোকে আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির যেকোনো ধরনের ভারসাম্যহীনতা দূর করার বিষয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি আশ্বস্ত করেন যে, অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রম অত্যন্ত সুচারুভাবে চলমান রয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বলেন যে, একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন প্রচেষ্টা ও নীতিগত সাফল্যের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র দেশীয় কারণগুলো বিশ্লেষণ করলেই চলবে না; বরং সেই দেশের ওপর আরোপিত বহিরাগত আকস্মিক ধাক্কা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে যে অন্যায্য সীমাবদ্ধতাগুলো চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেগুলোকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
কারণ, এই ধরনের বাহ্যিক ও ভূরাজনৈতিক চাপগুলো স্বভাবতই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের স্বাভাবিক পরিসরকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করে এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগুলোর শতভাগ কার্যকারিতা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের কৃত্রিম দেয়াল তৈরি করে।
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিস্থিতির ধারাবাহিক অস্থিতিশীলতার প্রসঙ্গ টেনে ইরানের এই শীর্ষ অর্থনীতিকর্তা আরও বলেন যে, আঞ্চলিক সংঘাত এবং পরাশক্তিগুলোর ছায়াযুদ্ধ কেবল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক পরিবহন ব্যবস্থা, মুক্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আন্তর্দেশীয় বিনিয়োগের প্রবাহকেও মারাত্মকভাবে নেতিবাচক উপায়ে প্রভাবিত করছে।
বর্তমান এই সংকটময় বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে একটি টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে বিশ্বের প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং তাদের যৌক্তিক ও বৈধ নিরাপত্তা-উদ্বেগগুলোর প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই নিঃশর্ত সম্মান দেখাতে হবে।
একে অপরের ওপর চাপ প্রয়োগ বা একতরফা আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতা পরিহার করে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা, শ্রদ্ধাবোধ এবং অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে আরও প্রসারিত করতে হবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
বিশ্ব অর্থনীতির এই চরম ক্রান্তিলগ্নে উদ্ভূত এই জটিল ও বহুমাত্রিক পরিস্থিতিগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের আরও বেশি স্বচ্ছ, স্পষ্ট, নিরপেক্ষ এবং সক্রিয় ভূমিকা পালনের প্রয়োজনীয়তার ওপর আব্দুন নাসের হেম্মাতি তাঁর ভাষণে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বৈশ্বিক আর্থিক সহযোগিতাকে আরও জোরদার করার লক্ষ্যে একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থার কার্যকর পরিচালনা তদারকির যে মহান ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব এই সংস্থাটির ওপর ন্যস্ত রয়েছে, পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের বাইরে বেরিয়ে এসে সেই দায়িত্ব তাদের যথাযথ ও নিরপেক্ষভাবে পালন করতে হবে।
কোনো নির্দিষ্ট দেশের রাজনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে যেন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করা না হয়, সে বিষয়েও তিনি প্রচ্ছন্ন কিন্তু অত্যন্ত জোরালো একটি বার্তা প্রদান করেন।
পরিশেষে, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেন যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক তদারকি কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সদস্যদেশগুলোর কেবল অভ্যন্তরীণ নীতিমালার মূল্যায়ন করলেই হবে না।
বরং একটি স্বাধীন দেশের ওপর অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ, একতরফা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক অর্থ পরিশোধের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার মতো নিষ্ঠুর পদক্ষেপগুলোর যে ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে, সেগুলোকেও অভ্যন্তরীণ নীতির মতো ঠিক সমান গুরুত্ব এবং সর্বোচ্চ নির্ভুলতার সঙ্গে বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করা উচিত।
এই বিশাল ও সংবেদনশীল দায়িত্ব পালনের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে বিশ্বের সব সদস্যদেশের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই একই মানদণ্ডে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ পরিচালনা করতে হবে।
এই ধরনের নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক ভূরাজনৈতিক প্রভাবগুলো কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সকল সদস্যদেশের মধ্যে একটি উন্মুক্ত, সক্রিয় এবং অর্থবহ সংলাপ জরুরি ভিত্তিতে শুরু করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি তাঁর এই ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণের সমাপ্তি টানেন।