আইআরজিসির নৌবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী ওজমায়ি সম্প্রতি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এই সরাসরি ও প্রকাশ্য সামরিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই বিবৃতি প্রকাশের পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ও উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী ওজমায়ি তার এই কড়া বার্তায় স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রয়েছে। তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, ওয়াশিংটনের যদি এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র কোনো সন্দেহ থাকে, তবে তারা যেন তাদের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলোকে এই জলপথের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার সাহস দেখায়।
টেলিভিশনে দেওয়া নিজের প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ওজমায়ি বলেন, আমেরিকানরা যদি সত্যিই মনে করে যে হরমুজ প্রণালি তাদের জন্য উন্মুক্ত, তাহলে তারা আরও কাছে আসুক।
আমরা হরমুজ প্রণালির ঠিক প্রবেশমুখে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর আসার অপেক্ষায় রয়েছি, যাতে সেগুলোকে চিরতরে ডুবিয়ে দিতে পারি। সত্যি বলতে, আমরা এই কাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার মুহূর্ত গুনছি।
সামরিক সক্ষমতার এক অভাবনীয় ও চাঞ্চল্যকর দাবি করে আইআরজিসির এই বর্ষীয়ান নৌ-কমান্ডার উল্লেখ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার বা এক হাজার তিনশো কোটি ডলার সমমূল্যের একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজকে ইতোমধ্যে তারা অকার্যকর বা নিষ্ক্রিয় করে দিতে সক্ষম হয়েছেন।
তার দাবি অনুযায়ী, ইরানি বাহিনীর সম্ভাব্য কড়া জবাবের মুখে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি আসার ন্যূনতম সাহস দেখাতে না পেরে ওই সুবিশাল মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি বাধ্য হয়ে এই কৌশলগত জলপথ থেকে অন্তত ৭০০ কিলোমিটার দূরে নিরাপদ দূরত্বে পিছু হটে গেছে।
তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এবং নিরপেক্ষ সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ অকার্যকর হওয়া এবং সেটি হরমুজ প্রণালি থেকে পিছু হটে যাওয়ার বিষয়ে আইআরজিসি কমান্ডারের এই সুনির্দিষ্ট দাবির স্বাধীন বা নিরপেক্ষ কোনো সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি স্নায়বিক যুদ্ধ ও তথ্যযুদ্ধের বিষয়টিও এই সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে আসে। রিয়ার অ্যাডমিরাল ওজমায়ি পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে তথ্যপ্রবাহ ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করে দেওয়ার এক গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন।
তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের জলসীমায় যেসব বিদেশি জাহাজ সামুদ্রিক ও আঞ্চলিক নিয়মকানুন লঙ্ঘন করছে, তাদের বিরুদ্ধে ইরান যে কঠোর আইনি ও সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, সেই খবরগুলো যেন বিশ্বের সাধারণ মানুষ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনোভাবেই জানতে না পারে, সে জন্যই পশ্চিমা বিশ্ব অত্যন্ত সুকৌশলে এই মিডিয়া সেন্সরশিপ বা তথ্য অবরোধের উদ্যোগ নিয়েছে।
তথ্য গোপনের এই পশ্চিমা অপচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেওয়ার বাস্তব উদাহরণ টেনে আইআরজিসি নৌবাহিনীর এই শীর্ষ কর্মকর্তা আরও জানান যে, বর্তমান এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সামুদ্রিক নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তির মুখে পড়া দুটি বিদেশি জাহাজের ঘটনার একটি প্রমাণস্বরূপ ভিডিও চিত্র আইআরজিসির নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে ইরান মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বার্তাই দিতে চায় যে, নিজেদের জলসীমার নিরাপত্তা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নয় এবং যেকোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখে দিতে তারা সদা প্রস্তুত।
তাসনিম নিউজের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এই সংবাদটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন বিশ্বরাজনীতিতে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এক দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল স্নায়ুযুদ্ধ চলমান রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে হরমুজ প্রণালি কেবল একটি সাধারণ সামুদ্রিক ট্রানজিট নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লাইফলাইন বা প্রাণভোমরা হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়, যা মূলত এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার সুবিশাল শক্তির চাহিদা মেটায়।
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই পথ ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছায়। সুতরাং, এই প্রণালিতে সামান্যতম সামরিক অস্থিরতা বা যুদ্ধাবস্থা তৈরি হলে মুহূর্তের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে ব্যাপক উল্লম্ফন ঘটতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি মারাত্মক মন্দার ঝুঁকি তৈরি করবে।
ঠিক এই কারণেই আইআরজিসি কমান্ডারের এই প্রকাশ্য হুমকিকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত গভীর উদ্বেগ এবং নিবিড় পর্যালোচনার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের নৌবাহিনীর মধ্যে বেশ কয়েকবার বিপজ্জনক ও কাছাকাছি অবস্থানের ঘটনা ঘটেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহর বা ফিফথ ফ্লিট, যার সদর দপ্তর বাহরাইনে অবস্থিত, তারা নিয়মিতভাবেই এই অঞ্চলে টহল দিয়ে থাকে। পেন্টাগনের দাবি, আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবাধ নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং মিত্র দেশগুলোর বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তাদের এই সামরিক উপস্থিতি।
অন্যদিকে, ইরান বরাবরই এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবং অন্যান্য পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিকে চরম উসকানিমূলক এবং নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
তেহরানের দীর্ঘদিনের দাবি, পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তার দায়িত্ব কেবল এই অঞ্চলের দেশগুলোরই নেওয়া উচিত, কোনো বহিরাগত পরাশক্তির এখানে হস্তক্ষেপ করার বা খবরদারি করার অধিকার নেই।
আইআরজিসির নৌবাহিনী, যা ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনীর পাশাপাশি একটি সমান্তরাল এবং অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক ইউনিট হিসেবে কাজ করে, তারা মূলত অপ্রতিসম বা অ্যাসিমেট্রিক যুদ্ধকৌশলে অত্যন্ত পারদর্শী।
ছোট, দ্রুতগামী স্পিডবোটের ঝাঁক, অত্যাধুনিক সামুদ্রিক মাইন, উপকূলীয় রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল এবং শক্তিশালী আত্মঘাতী ড্রোনের সমন্বয়ে তারা এক দুর্ভেদ্য উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী ওজমায়ির বক্তব্য মূলত ইরানের এই সামরিক আত্মবিশ্বাসেরই একটি পরিষ্কার ও জোরালো প্রতিফলন। যদিও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধরনের উচ্চাভিলাষী দাবি অনেক সময় মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ারের অংশ হিসেবেও বিবেচিত হয়, তবে এটি নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করে যে তেহরান কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের কাছে মাথানত করতে রাজি নয়।
সামগ্রিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ সহসাই প্রশমিত হওয়ার কোনো যৌক্তিক লক্ষণ নেই। ইরানের এই কঠোর অনমনীয় অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সামরিক উপস্থিতির ফলে হরমুজ প্রণালি যেন একটি সম্ভাব্য বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে।
যেকোনো ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি বা সামরিক উসকানি এই অঞ্চলে এক ভয়ানক সংঘাতের সূচনা করতে পারে, যার বিরূপ প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতিকেই এর চরম মূল্য চোকাতে হতে পারে।