আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সম্ভাব্য যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে যখন জোর আলোচনা চলছে, তখন খোদ ইসরায়েলি নেতৃত্বের এমন বার্তা নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইসরায়েলের স্থানীয় গণমাধ্যম চ্যানেল-১২ এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দাবি করেছিল যে, আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ইরানে নতুন করে আক্রমণ শানানোর জন্য সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি চাপ প্রয়োগ করছেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু।
তবে এই সংক্রান্ত খবরের রেশ কাটতে না কাটতেই ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সামরিক বেতার মাধ্যম ‘আর্মি রেডিও’-তে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, বর্তমান বাস্তবতায় ইরানের ওপর হামলা চালানো একেবারেই সুবিধাজনক নয়।
যদিও কোন নির্দিষ্ট কৌশলগত, ভূরাজনৈতিক বা সামরিক সীমাবদ্ধতার কারণে এই মুহূর্তে হামলা চালানোকে সুবিধাজনক মনে করছেন না, সে বিষয়ে তিনি বিশদ কোনো ব্যাখ্যা দেননি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো মধ্যপ্রাচ্যের এই দুই চিরবৈরী শক্তির সামরিক গতিবিধির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে।
ঠিক এই সময়েই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি নির্বাচন সমাগত। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের জাতীয় সংসদ নেসেটের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, আগামী ৪ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
পর্যবেক্ষকদের ধারণা ছিল, দুই দেশের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার কৌশল হিসেবে হয়তো আঞ্চলিক সংঘাতকে উসকে দেওয়া হতে পারে। ইসরায়েলি চ্যানেল-১২ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, ইসরায়েলের সংসদীয় নির্বাচনের আগেই ইরানে আরেক দফা জোরালো সামরিক অভিযান সম্পন্ন করতে ওয়াশিংটনের প্রতি নীতিগত চাপ সৃষ্টি করেছিলেন নেতানিয়াহু।
তবে গণমাধ্যমে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জনসমক্ষে এসে সেই জল্পনা অনেকটাই প্রশমিত করার চেষ্টা করেন এবং আকার-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন যে তেহরানের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বড় ধরনের কোনো সংঘাতের সূচনা করার মতো সামরিক বা রাজনৈতিক পরিকল্পনা তেল আবিবের বিবেচনায় নেই।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং আসন্ন নির্বাচনে সরকার গঠনের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। তিনি জানিয়েছেন, তার দল দক্ষিণপন্থি লিকুড পার্টি যদি আসন্ন নেসেট নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে কিংবা জোট সরকার গঠন করে, তাহলেও বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গিভিরকে কোনো অবস্থাতেই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মতো স্পর্শকাতর পদের দায়িত্ব দেওয়া হবে না।
উগ্র দক্ষিণপন্থি নেতা হিসেবে পরিচিত বেন গিভির ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে দাবি করেছেন যে, নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে পুনরায় জোট গঠন করতে হলে তাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দিতে হবে। এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সুস্পষ্ট অবস্থান পরিষ্কার করে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, বেন গিভির এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করলেও এ বিষয়ে তাকে পদটি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভটি লিকুড পার্টির নিজস্ব কাঠামোর ভেতরেই থাকবে এবং এটি কোনো রাজনৈতিক বোঝাপড়ার বিনিময়ে অন্য দলের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে না।
এদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করতে ইরানও নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে। তেহরানের প্রতিরক্ষা সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, যেকোনো মুহূর্তে আকাশপথে বা জলপথে যৌথ আক্রমণ আসতে পারে-এমন আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী।
ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে যে, যদি তাদের গোয়েন্দা নজরদারিতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আগ্রাসনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে, তবে ইরান আত্মরক্ষার স্বার্থে আগাম প্রতিরোধমূলক আঘাত হানতে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ করবে না।
এই প্রেক্ষাপট স্পষ্ট করে যে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক উসকানি এক ভয়ংকর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির ওপর নজর রাখার পাশাপাশি তেহরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি প্রস্তুত রেখেছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এখন এক গভীর অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি এক চরম স্পর্শকাতর মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে ইসরায়েলি নেতৃত্বের কৌশলগত হিসেব-নিকেশ, অন্যদিকে ইরানের পূর্ণাঙ্গ সামরিক প্রস্তুতি-এই দ্বিমুখী বাস্তবতায় যেকোনো হঠকারী পদক্ষেপ সমগ্র অঞ্চলকে এক দীর্ঘস্থায়ী এবং ধ্বংসাত্মক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো তাই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই পরিস্থিতির প্রতিটি কূটনৈতিক এবং সামরিক পদক্ষেপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।