আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে এই বার্তা দিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের কূটনৈতিক উপদেষ্টা ড. আনোয়ার গারগাশ।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান-এই ছয়টি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি ভুক্ত দেশগুলোর পারস্পরিক সংহতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় ড. আনোয়ার গারগাশ উল্লেখ করেন যে, আঞ্চলিক উত্তেজনার শুরু থেকেই আগ্রাসী পক্ষগুলো উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে এক ধরনের কৌশলগত দুর্বলতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে।
আগ্রাসনকারীদের ধারণা ছিল এই অঞ্চলের দেশগুলো কোনো বড় দ্বন্দ্বে জড়াতে আগ্রহী নয় এবং যে কোনো মূল্যে তারা সংঘাত এড়িয়ে চলার পথ খুঁজবে। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করেছে যে এই অঞ্চলের সকল রাষ্ট্রই সমানভাবে বৈরী শক্তির নিশানায় রয়েছে এবং তাদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
উপসাগরীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে অবিচ্ছেদ্য ও যৌথ দায়িত্ব হিসেবে অভিহিত করে আমিরাতের এই শীর্ষ কূটনীতিক জানান, এই সুরক্ষাবলয় সুসংহত করার দায়িত্ব কোনোভাবেই অবহেলা করার বা বিলম্বিত করার সুযোগ নেই।
বিশেষ করে সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে যৌথ কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি একটি কার্যকর সম্মিলিত প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যে ঘাটতি রয়েছে, সেই শূন্যতাই মূলত আঞ্চলিক প্রতিপক্ষগুলোকে আন্তর্জাতিক সীমারেখা অতিক্রম করতে এবং বেপরোয়া পদক্ষেপ নিতে প্ররোচিত করেছে বলে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে প্রকাশ করেন।
সৌদি ভূখণ্ডে ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনীর একের পর এক প্রাণঘাতী ও বিধ্বংসী হামলার পটভূমিতেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে এই সরাসরি প্রতিক্রিয়া এল। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই তীব্র সংঘাত মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান বিস্তৃত যুদ্ধের একটি প্রত্যক্ষ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, যার সূত্রপাত হয়েছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের বৈরিতার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা অভূতপূর্ব মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মারাত্মক প্রভাব পড়ছে সীমান্তবর্তী দেশগুলোর সার্বিক নিরাপত্তার ওপর।
সৌদি আরব ও হুথি বাহিনীর মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস প্রায় এক দশকের পুরোনো। ২০১৫ সালে হুথি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং সমগ্র উত্তর অঞ্চলের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে দেশটির তৎকালীন বৈধ প্রেসিডেন্ট আবদারাব্বুহ মনসুর হাদি প্রাণ বাঁচাতে সৌদি আরবে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
তৎকালীন ক্ষমতাচ্যুত সরকারকে পুনর্বহাল করতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী বহুজাতিক সামরিক জোট গঠিত হয় এবং তারা ইয়েমেনে তীব্র অভিযান শুরু করে।
তবে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক ও রণকৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে ২০১৯ সাল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পর্যায়ক্রমে তাদের সেনা প্রত্যাহার শুরু করে এবং ২০২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সামরিক জোট থেকে নিজেদের পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেয়।
বর্তমানে ইয়েমেনের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সুস্পষ্ট বিভাজন বিদ্যমান, যেখানে রাজধানী সানা ও উত্তরাঞ্চল পুরোপুরি হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং দক্ষিণাঞ্চল পরিচালনা করছে সৌদি-সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল সরকার।
২০২২ সালে জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার ফলে বিগত প্রায় চার বছর পুরো অঞ্চল এক ধরনের আপেক্ষিক শান্তাবস্থা প্রত্যক্ষ করে। তবে সেই স্থিতিশীলতার অবসান ঘটে গত ১৩ জুলাই, যখন রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়।
এরপর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাসভঙ্গ ও উত্তেজনা আবার নতুন করে তীব্র রূপ ধারণ করে। পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে সেপ্টেম্বর মাস থেকে, যখন হুথি যোদ্ধারা সরাসরি সৌদি আরবের মূল অর্থনৈতিক ও সামরিক অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্য করে নতুন করে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে।
এতে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোয় দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম সংবেদনশীল পথ লোহিত সাগরের উপকূল এবং এডেন উপসাগরের প্রবেশদ্বার খ্যাত কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ গত মাসে নিজেদের কবজায় নিয়ে নেয় হুথিরা।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ফলে সমুদ্রপথে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল ও বাণিজ্যিক পণ্য রপ্তানি এক নজিরবিহীন বাধার মুখে পড়েছে, যা গোটা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আঞ্চলিক এই সংঘাতের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে অতি সম্প্রতি। গত শনিবার, রবিবার এবং সোমবার-টানা তিন দিন সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে একের পর এক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে হুথি যোদ্ধারা।
বেসামরিক বিমান চলাচলের এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে এমন বেপরোয়া হামলায় মোট ১৪ জন নিহত এবং তিন শতাধিক ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়েছেন। খোদ রাজধানীতে সরাসরি এই প্রাণঘাতী আঘাতের ঘটনাই উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে আমিরাত প্রশাসন পুরো অঞ্চলের সম্মিলিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করার তাগিদ দিয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা ও নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে এই সংঘাত কেবল উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক স্থায়িত্বকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলবে।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই সতর্কতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আসন্ন দিনগুলোতে নিজেদের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত রাখতে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো একটি অভিন্ন সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশলের অধীনে একত্রিত হওয়ার দিকেই এগোচ্ছে।