রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলা অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি দিল ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৫৩ পিএম

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলা অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি দিল ইরান
ছবি: Al Jazeera

মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে চরম সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় এই এলাকায় নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং যেকোনো সম্ভাব্য বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে প্রয়োজনে বিদেশি বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলা অব্যাহত রাখার সরাসরি ঘোষণা দিয়েছে ইরান।

 

দেশটির সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এই কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের প্রধান রুট হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে ইরানের এমন অনমনীয় অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নতুন করে এক অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছে।

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার এবং সেনাবাহিনীর উপ-সমন্বয়ক রিয়ার অ্যাডমিরাল হাবিবুল্লাহ সাইয়ারি এই কঠোর বার্তা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষার খাতিরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী শত্রুপক্ষের জাহাজগুলোতে আঘাত হানতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করবে না।

 

কমান্ডার হাবিবুল্লাহ সাইয়ারি বলেন, নিজেদের জলসীমায় অবস্থানরত বা দেশের বিরুদ্ধে হুমকি সৃষ্টিকারী শত্রুর বিভিন্ন জাহাজে ইরান অতীতেও কঠোর আঘাত হেনেছে এবং ভবিষ্যতেও যদি ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আগ্রাসন বা প্রতিকূল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, তবে তেহরান আবারও অত্যন্ত কঠোরভাবে পাল্টা জবাব দেবে।

 

তিনি দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন যে, ইরান কোনোভাবেই অসহায় বা আবদ্ধ অবস্থায় নেই। বরং দেশটির হাতে প্রচলিত ও বিশেষায়িত এমন সব সামরিক সক্ষমতা ও উন্নত প্রযুক্তি রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত বিরল ও সুনির্দিষ্ট।

 

ইরানি সামরিক কমান্ডারের এই মন্তব্য এমন এক সংকটপূর্ণ সময়ে প্রকাশ্যে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ ও ড্রোন হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী, যা ওমান উপসাগর এবং পারস্য উপসাগরের মিলনস্থল, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সবচেয়ে সংবেদনশীল চেকপয়েন্ট হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত সমুদ্রবাহিত জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবাহিত হয়।

 

ফলে এই নৌপথে যেকোনো ধরনের সামান্য সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজারে তাৎক্ষণিক অস্থিরতা তৈরি করে এবং তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে একাধিক তেলবাহী ট্যাংকার অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল বা ড্রোনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল সংস্থাগুলো এবং বৃহৎ বাণিজ্য পরিচালনাকারী দেশগুলো ইতোমধ্যে চরম উদ্বেগে রয়েছে।

 

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সাথে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে পরমাণু কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বৈরিতা বারবার এই জলসীমায় এসে ধাক্কা খেয়েছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা অতীতে বহুবার হরমুজ প্রণালীতে স্বাধীনভাবে জাহাজ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক জোট গঠন এবং সামরিক যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে। অন্যদিকে ইরান সবসময়ই অভিযোগ করে আসছে যে, বাইরের শক্তির উপস্থিতি এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও নিরাপত্তাকে বিনষ্ট করছে।

 

তেহরানের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, পারস্য উপসাগর ও এর তীরবর্তী এলাকার সমুদ্র নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপরই বর্তায়, সেখানে কোনো বিদেশি যুদ্ধজাহাজের অনাহূত অনুপ্রবেশ বরদাশত করা হবে না।

 

হাবিবুল্লাহ সাইয়ারির বক্তব্যে ইরানের অভ্যন্তরীণ সামরিক আত্মবিশ্বাসও বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও ইরান নিজস্ব প্রযুক্তিতে শক্তিশালী নৌবহর, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ডুবোজাহাজ এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

 

পারস্য উপসাগরের অগভীর জলে দ্রুতগতির আক্রমণকারী নৌকা ও ড্রোন ব্যবহারের বিশেষায়িত রণকৌশল তেহরানকে প্রচলিত বৃহৎ নৌবাহিনীর বিরুদ্ধেও শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতা প্রদান করেছে।

 

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই সামরিক প্রস্তুতি নিছক প্রদর্শনীর জন্য নয়, বরং যেকোনো বহিরাগত সামরিক হস্তক্ষেপের মুখে এই সমগ্র সামুদ্রিক রুট সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ করে দেওয়ার মতো কার্যকর ক্ষমতা তারা অর্জন করেছে।

 

সাইয়ারির এই সরাসরি হুমকি মূলত সেই সক্ষমতারই একটি প্রকাশ্য বার্তা, যা সরাসরি তেহরানের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষদের প্রতি ছুড়ে দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যিক অঙ্গনেও এক বিশাল অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।

 

সমুদ্রপথে পরিচালিত পরিবহন সংস্থাগুলো তাদের পণ্যবাহী জাহাজ এবং তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করতে বাধ্য হচ্ছে। যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বৃদ্ধির অজুহাতে আন্তর্জাতিক বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমা দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর প্রিমিয়ামের হার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

জাহাজ মালিকেরা অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প ও দীর্ঘ পথ ব্যবহারের কথা বিবেচনা করছেন, যার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়ছে পরিবহন ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বৈশ্বিক মূল্যের ওপর। ফলে সংঘাতপূর্ণ এই অঞ্চলের প্রতিটি সামরিক বিবৃতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিপথকে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

 

আন্তর্জাতিক আইন ও সামুদ্রিক নীতিমালা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্মুক্ত সমুদ্রে যেকোনো ধরনের জাহাজে সামরিক হামলা চালানো সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের পরিপন্থী। তবে কোনো দেশ যখন আত্মরক্ষা ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষার যুক্তি তুলে ধরে, তখন সেই বিতর্ক জটিল আকার ধারণ করে।

 

পশ্চিমা কূটনীতিকরা বারবার কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে জলপথের উন্মুক্ততা বজায় রাখার তাগিদ দিয়ে আসছেন। তবে তেহরান মনে করে, অর্থনৈতিক অবরোধ ও আঞ্চলিক চাপের মুখে তাদের ওপর অন্যায় আচরণ করা হচ্ছে এবং সামরিক ভারসাম্য রক্ষা না হলে তারা একতরফা কোনো শর্ত মেনে নেবে না।

 

হাবিবুল্লাহ সাইয়ারির সাম্প্রতিক এই বক্তব্য থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, ইরান তার নিজস্ব শর্তে এবং সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত কৌশলের আলোকেই এই অঞ্চলের সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণ করতে চায়। সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, রিয়ার অ্যাডমিরাল হাবিবুল্লাহ সাইয়ারির এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বিপজ্জনক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

 

হরমুজ প্রণালীর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক করিডোরে যেকোনো সামরিক ভুল বোঝাবুঝি বা আকস্মিক সংঘাত দ্রুতই একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বহন করে।

 

বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো এবং জাতিসংঘ যদি অবিলম্বে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করে, তবে পারস্য উপসাগরের এই জলপথ যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ এক সামরিক সংঘর্ষের প্রধান রণক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে, যার মাশুল দিতে হবে গোটা বিশ্ব অর্থনীতিকে।

 

- আল জাজিরা