রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে ইরানি পরমাণুবিজ্ঞানী আমির হোসেইন ফকিহির গবেষণাপত্র

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:০০ পিএম

আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে ইরানি পরমাণুবিজ্ঞানী আমির হোসেইন ফকিহির গবেষণাপত্র
ছবি : Collected

বিজ্ঞানের সাধনা ও জ্ঞান অন্বেষণের পথ কখনো মৃত্যুকে দিয়ে চিরতরে স্তব্ধ করা যায় না। মানুষের নশ্বর দেহ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তার রেখে যাওয়া মেধা, সৃষ্টি ও গবেষণার নির্যাস যুগের পর যুগ মানবসভ্যতাকে আলোকিত করে যায়।

 

ঠিক এমনই এক অমরত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ইরানের প্রখ্যাত পরমাণুবিজ্ঞানী এবং শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষক ড. সাইয়্যেদ আমির হোসেইন ফকিহি জাদেহ। মর্মান্তিক এক হামলায় তিনি শাহাদাতবরণ করার এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর, আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত সমাদৃত ও স্বনামধন্য বিজ্ঞান সাময়িকী 'এআইপি অ্যাডভান্সেস'-এ তাঁর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

 

এই প্রকাশনা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত মেধার স্বীকৃতিই নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে, প্রকৃত বিজ্ঞানীর কাজ সীমানা ও সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার বরাত দিয়ে পার্সটুডে এই তাৎপর্যপূর্ণ সংবাদটি বৈশ্বিক গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেছে।

 

ড. সাইয়্যেদ আমির হোসেইন ফকিহির এই সদ্য প্রকাশিত গবেষণাপত্রটি বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন এবং পারমাণবিক প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষকদের কাছে তাঁর এই কাজ নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

 

গবেষণাপত্রটির মূল বিষয়বস্তু হলো প্রোটন উৎপাদনকারী উৎসের জন্য একটি অত্যন্ত উন্নত ও আধুনিক চৌম্বকীয় কাঠামোর নকশা প্রণয়ন এবং তার সফল নির্মাণপ্রক্রিয়া। আধুনিক পারমাণবিক বিজ্ঞানের জগতে এই বিষয়টি অত্যন্ত জটিল এবং সময়োপযোগী।

 

এই গবেষণায় তিনি মূলত পারমাণবিক প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্যবস্থার শক্তি খরচ বা এনার্জি কস্ট কীভাবে উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা যায়, তার একটি বৈজ্ঞানিক সমাধান বিশদভাবে তুলে ধরেছেন।

 

একই সঙ্গে, ভারী ও বিশালাকার সরঞ্জামগুলোর আকার কীভাবে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ছোট করে আনা সম্ভব এবং এর সামগ্রিক কার্যকারিতা বা এফিশিয়েন্সি কীভাবে বহুগুণে বৃদ্ধি করা যায়, তার একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত রূপরেখা এই গবেষণাপত্রে প্রদান করা হয়েছে।

 

বিজ্ঞানীদের মতে, ড. ফকিহির এই নকশা আগামী দিনের পারমাণবিক চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে শুরু করে শক্তি উৎপাদন-সব ক্ষেত্রেই অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গবেষণার অঙ্গনে ড. ফকিহির এই ফিরে আসা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি তাঁর আজীবনের নিরলস অধ্যবসায় ও মেধার এক স্বাভাবিক পরিণতি।

 

১৯৭৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (ইরানি বর্ষপঞ্জিকা অনুযায়ী ১৩৫৭ সালের ২০ শাহরিভার) জন্মগ্রহণ করা এই মেধাবী বিজ্ঞানী তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপে শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বা পারমাণবিক প্রকৌশলবিদ্যায়, বিশেষ করে শক্তি বিভাগে তাঁর উচ্চতর পড়াশোনা সম্পন্ন করেন এবং অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

 

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি নিজেকে কেবল গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং তাঁর অর্জিত জ্ঞান নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্রত গ্রহণ করেন। তিনি ইরানের বিখ্যাত শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের একজন পূর্ণকালীন অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘ সময় অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন একাধারে একজন আদর্শ শিক্ষক এবং একজন দূরদর্শী পথপ্রদর্শক। অধ্যাপনার পাশাপাশি ড. সাইয়্যেদ আমির হোসেইন ফকিহি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারমাণবিক গবেষণার প্রসারে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও গবেষণামূলক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

 

তিনি ইরানের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও পারমাণবিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি রেডিয়েশন অ্যাপ্লিকেশন বা বিকিরণ প্রয়োগ বিভাগের প্রধান এবং ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার উপপ্রধান হিসেবেও দেশের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন।

 

তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ইরানের পারমাণবিক গবেষণা একটি নতুন ও আধুনিক রূপ লাভ করেছিল, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও অত্যন্ত সমীহের চোখে দেখা হতো। একজন তরুণ বিজ্ঞানী হিসেবে এত অল্প বয়সে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর দায়িত্ব সামলানো তাঁর অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা ও মেধারই জ্বলন্ত প্রমাণ বহন করে।

 

বিজ্ঞান ও গবেষণায় তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ড. ফকিহি তাঁর কর্মজীবনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। তিনি বরাবরই তাঁর কাজের ক্ষেত্রে ছিলেন আপসহীন ও নিবেদিতপ্রাণ।

 

২০০৯ সালে তিনি ফলিত গবেষণা বিভাগে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ২৩তম আন্তর্জাতিক খাওয়ারিজমি উৎসবে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এরপর ২০১০ সালে তিনি শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ গবেষক হিসেবে নির্বাচিত হন।

 

তাঁর শিক্ষাদানের অসাধারণ শৈলী ও একাগ্রতার জন্য ২০১১ সালে তাঁকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শ শিক্ষকের সম্মানে ভূষিত করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে (ফার্সি ১৩৯৪ সালে) তিনি পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত গবেষক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

 

এই প্রতিটি সম্মাননা ছিল তাঁর নিরলস পরিশ্রম ও বিজ্ঞানের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসার এক একটি উজ্জ্বল মাইলফলক। তবে এই মেধাবী বিজ্ঞানীর জীবনের সমাপ্তি ঘটে অত্যন্ত ট্র্যাজিক এবং অভাবনীয় এক পরিস্থিতিতে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের এক নিষ্ঠুর শিকার হতে হয় তাঁকে।

 

গত ২০২৫ সালের ১৩ জুন, শুক্রবার, ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থিত তাঁর নিজ বাসভবনে ইসরায়েলি বাহিনীর এক অতর্কিত ও ভয়াবহ বিমান হামলায় তিনি শাহাদাতবরণ করেন। তাঁর এই অকাল প্রয়াণ কেবল ইরানের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের বিজ্ঞান অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

একজন বিজ্ঞানীর কাজ হলো মানবতার কল্যাণ সাধন করা, অথচ সেই বিজ্ঞানন সাধনাতেই রত থাকা অবস্থায় তাঁকে এভাবে প্রাণ হারাতে হলো, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক সমালোচনা ও শোকের ছায়া ফেলেছিল।

 

আজ তাঁর মৃত্যুর এক বছরের বেশি সময় পর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাময়িকীতে তাঁর এই গবেষণাপত্রের প্রকাশনা যেন তাঁর অমরত্বেরই এক নীরব ঘোষণা। ঘাতকের বুলেট বা বোমার আঘাত একজন বিজ্ঞানীর নশ্বর দেহকে হয়তো ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া জ্ঞান, আবিষ্কার ও চিন্তাধারাকে কোনোভাবেই মুছে ফেলতে পারে না।

 

ড. সাইয়্যেদ আমির হোসেইন ফকিহি জাদেহ আজ সশরীরে আমাদের মাঝে উপস্থিত নেই ঠিকই, কিন্তু তাঁর আবিষ্কৃত উন্নত চৌম্বকীয় কাঠামোর নকশা এবং বৈজ্ঞানিক আদর্শ আগামী দিনের অগণিত গবেষক ও বিজ্ঞানীদের জন্য অনন্তকাল ধরে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল বাতিঘর হয়ে কাজ করবে। বিজ্ঞানের পাতায় তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে, সম্পূর্ণ নিজস্ব মহিমায়।

 

- পার্সটুডে