রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদি আরবের সব বিমানবন্দরে হামলার হুঁশিয়ারি দিল হুথিরা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:৫৩ পিএম

সৌদি আরবের সব বিমানবন্দরে হামলার হুঁশিয়ারি দিল হুথিরা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন করে চরম উত্তেজনা ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে ইয়েমেনের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘোষণায়। পবিত্র দুই নগরী মক্কা ও মদিনা ছাড়া সৌদি আরবের অভ্যন্তরে অবস্থিত অন্য সব আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর এবং আকাশসীমা ব্যবহারের ওপর কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছে তারা।

 

এই গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোকে নিজেদের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ঘোষণা করে দেশি-বিদেশি সব পক্ষকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে গোষ্ঠীটি। ইয়েমেনের এই বিদ্রোহী তৎপরতার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক আকাশপথের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যিক বিমান পরিবহন ব্যবস্থার ওপর এক নতুন ও অপ্রত্যাশিত সংকটের কালো মেঘ দেখা দিয়েছে।

 

সংঘাতপূর্ণ এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

 

হুথি সামরিক বাহিনীর প্রধান মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিশেষ আনুষ্ঠানিক বার্তায় এই কঠোর হুঁশিয়ারি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

 

তিনি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সমস্ত জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা, সংশ্লিষ্ট খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাধারণ শ্রমিক এবং দেশি-বিদেশি সকল আকাশপথের যাত্রীদের প্রতি অত্যন্ত জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছেন।

 

তার স্পষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী, মক্কা ও মদিনা বাদে সৌদি আরবের অন্যান্য সকল বিমানবন্দর এবং দেশটির আকাশসীমা যেকোনো মুহূর্তে তাদের সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্যবস্তু বা ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে অনতিবিলম্বে এসব আকাশসীমা ও বিমানবন্দর ব্যবহার থেকে বিরত থাকার জন্য জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

 

হুথিদের এই সরাসরি সামরিক হুমকি সৌদি আরবের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রের যোগাযোগ কাঠামোর জন্য এক বিরাট আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে নিজেদের আক্রমণ পরিকল্পনার বাইরে কিছু নির্দিষ্ট এলাকাকে রাখার কথাও স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি।

 

তিনি তার বার্তায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, মুসলমানদের পবিত্রতম দুই ধর্মীয় স্থান অর্থাৎ মক্কা ও মদিনার বিমানবন্দরগুলো তাদের যেকোনো ধরনের আক্রমণ বা সামরিক অভিযানের আওতামুক্ত থাকবে।

 

ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর আবেগের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। পবিত্র এই দুই শহরের আকাশপথ ও বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াতকারী সাধারণ হজযাত্রী, ওমরাহ পালনকারী এবং অন্যান্য বেসামরিক মানুষের কোনো ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকবে না বলে আশ্বস্ত করেছে গোষ্ঠীটি।

 

এই ব্যতিক্রম ছাড়া সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ বা বাণিজ্যিক রাজধানী জেদ্দাসহ অন্যান্য যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ নগরীর বিমানঘাঁটি ও নাগরিক পরিবহন কেন্দ্র যেকোনো সময় তাদের ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

ইয়েমেনে বহু বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধ এবং এর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সঙ্গে হুথি বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল। মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের এই ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় আকাশপথের অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ঘটনা এর আগেও একাধিকবার আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

 

কিন্তু পবিত্র নগরী ব্যতীত দেশটির গোটা আকাশসীমাকে সরাসরি হামলার ক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করার মতো এমন চরমপন্থী অবস্থান দীর্ঘদিন পর আবারও আন্তর্জাতিক মহলের টনক নড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা আন্তর্জাতিক বেসামরিক উড়োজাহাজগুলো সৌদি আরবের আকাশসীমা ব্যবহার করে পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধের বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করে।

 

ফলে বিদ্রোহী এই গোষ্ঠীর এমন মারাত্মক হুমকির কারণে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থাগুলো এখন তাদের ফ্লাইটের গতিপথ পরিবর্তন করার বিষয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু করতে বাধ্য হতে পারে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে আকাশপথের জ্বালানি খরচ ও পরিচালন ব্যয় এক লাফে অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা সংক্রান্ত বৈশ্বিক কনভেনশন ও মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী, যেকোনো যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতের পরিস্থিতিতে বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে যাত্রীবাহী বিমান এবং সাধারণ বিমানবন্দরগুলোকে যেকোনো ধরনের সরাসরি আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখার বিধান রয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অসামরিক বিমানবন্দর ও আকাশপথকে এভাবে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ঘোষণা করা কেবল আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনই নয়, বরং তা নিরপরাধ সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের জীবনকেও এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়।

 

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও স্বাধীন বিশ্লেষকরা হুথিদের এমন হুমকির তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন যে, রাজনৈতিক ও সামরিক দ্বন্দ্বের হাতিয়ার হিসেবে বেসামরিক জনগণকে ঢাল বানানো কিংবা তাদের স্বাভাবিক চলাচলের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।

 

এদিকে হুথি বাহিনীর এই নতুন হুমকির পর আন্তর্জাতিক এভিয়েশন খাত ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা অংশীদাররা পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে নিরাপত্তার যেকোনো ধরনের অবনতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রতিদিন শত শত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল করে।

 

হুথিদের এই সামরিক বার্তা যদি বাস্তবে কোনো হামলায় রূপ নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল ইয়েমেন ও সৌদি আরবের দ্বিপাক্ষিক সীমানায় আবদ্ধ থাকবে না, বরং তা গোটা অঞ্চলের ভূকৌশলগত ভারসাম্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে এক মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে। এই ধরনের ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি এড়াতে কূটনৈতিক পর্যায়ে দ্রুত ও কার্যকর মধ্যস্থতা গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে উঠেছে।

 

- আল জাজিরা