রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রিয়াদ বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলা, দুই বাংলাদেশিসহ নিহত ১২

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:৫৯ পিএম

রিয়াদ বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলা, দুই বাংলাদেশিসহ নিহত ১২
ছবি : AA

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনা ঘটেছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত শনিবার চালানো এই বর্বরোচিত হামলায় অন্তত বারো জন নিরীহ মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন তিন শতাধিক মানুষ।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনাটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে গভীর শোক ও চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

একটি বেসামরিক ও ব্যস্ত যাত্রীবাহী বিমানবন্দরে এমন প্রাণঘাতী হামলাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করছে। নিহত বারো জন ব্যক্তির জাতীয়তা ও পরিচয় ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছে সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

 

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই বর্বরোচিত হামলায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন চারজন সৌদি আরবের নাগরিক এবং দুজন বাংলাদেশের নাগরিক। বাংলাদেশি নাগরিকদের এই অকাল প্রয়াণ প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে এক গভীর শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ও উন্নয়নে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের যে অসামান্য অবদান রয়েছে, তার মধ্যেই এমন করুণ পরিণতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এছাড়া নিহত বাকি ছয়জনের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন এবং সুদানের একজন করে নাগরিক রয়েছেন।

 

বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু এই হামলার ভয়াবহতা ও আন্তর্জাতিক মাত্রাকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। হতাহতদের উদ্ধার করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রিয়াদের বিভিন্ন উন্নত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আহত তিন শতাধিক যাত্রীর মধ্যে অনেকের অবস্থাই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।

 

জরুরি বিভাগ ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসকেরা আহতদের জীবন বাঁচাতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের আকস্মিক আগমনে হাসপাতালগুলোতে এক অভূতপূর্ব জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

 

স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং রক্তের প্রয়োজন মেটাতে সাধারণ নাগরিকদের প্রতি রক্তদানের মানবিক আহ্বান জানিয়েছে।

 

কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শুধু সৌদি আরবের জন্যই নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার পরপরই যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিয়ে বিমানবন্দরে সকল ধরনের উড্ডয়ন ও অবতরণ কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল।

 

আকস্মিক এই অচলাবস্থার কারণে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি যাত্রী চরম ভোগান্তির শিকার হন। টার্মিনাল ভবনগুলোতে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং যাত্রীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে তাৎক্ষণিক ও পেশাদার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

 

বিমান চলাচলের এই আকস্মিক বিপর্যয়ের কারণে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। যাত্রীদের বিমানবন্দরে আসার আগে নিজ নিজ এয়ারলাইন্সের সাথে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

 

এই উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে প্রতিবেশী দেশ কুয়েতের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা কুয়েত এয়ারওয়েজ শনিবার রিয়াদের উদ্দেশ্যে তাদের সকল ফ্লাইট এবং রিয়াদ থেকে ফিরতি ফ্লাইট সম্পূর্ণভাবে বাতিল ঘোষণা করেছে।

 

অন্যান্য আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোও তাদের ফ্লাইট সূচিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী আকাশপথের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত স্থবিরতা নেমে এসেছে।

 

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী বর্তমানে হামলার ধরন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করছে। হামলায় বিমানবন্দরের অবকাঠামো ও বেশ কিছু সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

 

তদন্তকারী দল ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করছেন এবং বিমানবন্দরের সকল সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনরায় যাত্রীদের ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ কি না, তা যাচাই-বাছাই করছেন।

 

নিরাপত্তা ছাড়পত্র পাওয়ার পরই কেবল বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার ঘটনাটি হঠাৎ করে ঘটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

 

সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার এবং গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দ্বারা পরিচালিত ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার যে প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, এটি তারই এক ভয়াবহ সম্প্রসারণ।

 

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘকাল ধরে চলমান এই ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও অস্থিরতা এখন সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমন বেপরোয়া আক্রমণ প্রমাণ করে যে, সংঘাতের মাত্রা এখন একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

 

এই মর্মান্তিক ও কাপুরুষোচিত হামলার পরপরই ইয়েমেনে লড়াইরত সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট অত্যন্ত কঠোর ও সুস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। সামরিক জোটের পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে যে, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো এই বর্বরোচিত হামলার একটি 'দৃঢ় ও দাঁতভাঙা' জবাব দেওয়া হবে।

 

জোটের এমন কড়া বার্তার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আশঙ্কা করছে যে, আগামী দিনগুলোতে ওই অঞ্চলে সামরিক সংঘাত ও উত্তেজনা আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ইয়েমেন ও সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও বেশি অস্থিতিশীল করে তুলবে।

 

রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার এই ঘটনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তাও চরম হুমকির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম এজেন্সির বা সামুদ্রিক সংস্থার দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে অজ্ঞাত কোনো প্রজেক্টাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, যার ফলে জাহাজটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়।

 

একই সময়ে আকাশ ও জলপথে এমন সমন্বিত ও ধারাবাহিক আক্রমণ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। বেসামরিক স্থাপনা ও যাত্রীবাহী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ ধরনের প্রাণঘাতী হামলা জেনেভা কনভেনশনসহ আন্তর্জাতিক আইনের সম্পূর্ণ ও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ঘৃণ্য হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং দোষীদের দ্রুত আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছে।

 

তারা সংঘাতরত সকল পক্ষকে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে নতুন করে আর কোনো নিরীহ মানুষের রক্ত না ঝরে। পরিশেষে, রিয়াদ বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ হামলা শুধু সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক বিমান চলাচল ও মানবাধিকারের জন্য এক বিরাট অশনিসংকেত।

 

নিহত বারো জন মানুষ, যাদের মধ্যে দুজন প্রবাসী বাংলাদেশিও রয়েছেন, তাদের এই অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। স্বজনহারা পরিবারগুলোর কান্না ও আর্তনাদ বিশ্ববিবেকের কাছে একটিই বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে যে, রাজনৈতিক বা সামরিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানানো মানবতার চরম অবমাননা।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখন কেবল নিন্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, মধ্যপ্রাচ্যে একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো কোনো বেসামরিক স্থাপনায় ভবিষ্যতে আর কখনো এমন রক্তপাত ও ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

 

- আনাদোলু এজেন্সি