মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানে মাত্রাতিরিক্ত পদক্ষেপে সংকট ঘনীভূত

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:০৭ পিএম

ইরানে মাত্রাতিরিক্ত পদক্ষেপে সংকট ঘনীভূত
ছবি : Collected

চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের নেতৃত্বকে পরাস্ত করার প্রক্রিয়ায় ওয়াশিংটন দৃশ্যত মাত্রাতিরিক্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই অতিরিক্ত কঠোরতার সরাসরি পরিণতি হিসেবে এখন কূটনৈতিক সমঝোতা বা শান্তি আলোচনার জন্য তেহরানে কোনো দায়িত্বশীল বা উপযুক্ত প্রতিনিধি খুঁজে পেতে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন তীব্র সংকটের মুখে পড়েছে।

 

মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এই অপ্রত্যাশিত স্বীকারোক্তি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ইয়ংস্টাউন শহরে আয়োজিত ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির এক বিশাল নির্বাচনী সমাবেশে উপস্থিত হয়ে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।

 

সেখানে প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান মধ্যকার সম্ভাব্য শান্তি সংলাপ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক স্থবিরতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি খোলামেলাভাবে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, ইরানের নেতৃত্বকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে তাদের গৃহীত পদক্ষেপগুলো সম্ভবত পরিমিতির সীমা অতিক্রম করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এই মুহূর্তের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ওয়াশিংটন ঠিক নিশ্চিত হতে পারছে না যে ইরানের ঠিক কোন স্তরের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর কোনো সংলাপ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

 

এমনকি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রতিকূলতার কারণে বর্তমানে দেশটিতে নতুন করে কোনো নেতা শীর্ষ প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তেহরানের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পশ্চিমা মহলে যাদের বিবেচনা করা হচ্ছিল, তাদের কেউই বর্তমান পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিতে সম্মত হচ্ছেন না।

 

আলোচনার জন্য উপযুক্ত অংশীদার নির্বাচনের এই শূন্যতা যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের কূটনৈতিক জটিলতায় ফেলেছে বলে ট্রাম্প অকপটে স্বীকার করেন। কূটনৈতিক স্তরে এমন অনিশ্চয়তা প্রকাশ করলেও সামরিক শক্তি প্রদর্শনের বিষয়ে নিজের অবস্থানে অবিচল রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

তিনি দাবি করেন যে, বিগত প্রায় আট মাসের টানা সামরিক অভিযানে ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা প্রায় সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে দেশটির বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর ওপর মারাত্মক আঘাত হানা হয়েছে বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।

 

ট্রাম্পের দাবি, নৌ অভিযানের মুখে ইরানের নৌবাহিনীর একশত ঊনষাটটি জাহাজের সবগুলোই চূড়ান্তভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে এবং দেশটির সামগ্রিক নৌবহর ও রণতরীগুলো এখন সমুদ্রের তলদেশে নিমজ্জিত অবস্থায় রয়েছে। ওয়াশিংটনের নেওয়া সামরিক পদক্ষেপের ধ্বংসাত্মক কার্যকারিতা তুলে ধরতেই তিনি এমন কঠোর চিত্র তুলে ধরেন।

 

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন বক্তব্য এমন এক সময়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় উত্তেজনার পারদ ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক পথ হরমুজ প্রণালিসহ পারস্য ও ওমান উপসাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ধারাবাহিক আক্রমণের ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

 

বিশেষ করে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নজরদারি সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্সের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত অক্টোবর মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এই জলসীমায় অন্তত উনিশটি বাণিজ্যিক জাহাজে সরাসরি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

 

ফলে একদিকে সমুদ্রে পাল্টাপাল্টি সামরিক অস্থিরতা এবং অন্যদিকে মূল ভূখণ্ডে রাজনৈতিক নেতৃত্বের টানাপোড়েন পুরো অঞ্চলকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ চলাকালীন পরিস্থিতিতে শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে পুনর্গঠন করার প্রচেষ্টা সবসময় একতরফাভাবে কার্যকর হয় না।

 

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে সেই বাস্তবতারই এক ধরনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোকে সমূলে উপড়ে ফেলার পর সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে আলোচনার উপযোগী বৈধ প্রতিনিধি না পাওয়া বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে একটি পরিচিত জটিলতা।

 

ওয়াশিংটন একদিকে ইরানের প্রচলিত সামরিক বাহিনীকে দুর্বল করার দাবি করছে, অন্যদিকে সংকট থেকে উত্তরণের পথ খোঁজার মতো রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারী না পেয়ে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক পণ্যের অবাধ প্রবাহ বজায় রাখা যেখানে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য, সেখানে এই ধরনের সামরিক অচলাবস্থা বৈশ্বিক বাজারেও বড় প্রভাব ফেলছে।

 

কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা ইঙ্গিত করে যে, ইরানের নেতৃত্বের ওপর চূড়ান্ত চাপ প্রয়োগ করা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের প্রতিরোধ পুরোপুরি স্তিমিত হয়নি। বরং রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও বেশি অনিশ্চিত ও বহুমুখী ঝুঁকির মুখে পতিত হচ্ছে।

 

সামগ্রিক এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজস্ব মূল্যায়ন যুদ্ধকালীন কূটনীতির এক জটিল অধ্যায় উন্মোচন করেছে। ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা সামরিক বিজয় অর্জনের পথে কতটা অগ্রসর হতে পেরেছেন এবং সেই অগ্রযাত্রার পর সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার মতো বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক অংশীদার আদৌ খুঁজে পাওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মহলেই এখন জোরালো বিতর্ক তৈরি হচ্ছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কেবল সামরিক শক্তির প্রয়োগ যথেষ্ট নয়, বরং একটি কার্যকর রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে বোঝাপড়া যে কতটা অপরিহার্য, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক বক্তব্য মূলত সেই বাস্তব সত্যটিকেই সামনে এনে দিয়েছে।

 

- দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, আল জাজিরা