তুরস্কের জাতীয় সংসদে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পাস হওয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংক্রান্ত আইনের অংশ হিসেবে এই নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ কার্যকর করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুদের মানসিক বিকাশ ও অনলাইন সুরক্ষার বিষয়টিকে সামনে রেখে নানা আলোচনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই তুরস্কের পক্ষ থেকে এ ধরনের একটি সমন্বিত ও বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্তের কথা জানানো হলো।
সরকারি গেজেটে প্রকাশিত নীতিমালায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলো কোনোভাবেই নির্ধারিত বয়সের নিচের শিশুদের নিজেদের সেবার আওতায় আনতে পারবে না। একই সঙ্গে পনেরো বছর বা তার বেশি বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও সাধারণ প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ও সুরক্ষিত সেবা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।
এই বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য সেবা দেওয়ার সময় তাদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং আবেগীয় বিকাশের বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ডিজিটাল দুনিয়ায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষায় প্ল্যাটফর্মগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুস্পষ্ট তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
নতুন এই নিয়মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বয়স নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার শর্ত। নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই করার সময় ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ও পরিচয় যাতে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিচয় নির্ধারণের নামে অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের বদলে শুধুমাত্র ওই ব্যক্তি নির্ধারিত বয়সের সীমারেখা অতিক্রম করেছে কি না, তা যাচাই করার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। এই যাচাই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না এবং ব্যবহারকারীর গোপনীয়তাকে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ করা চলবে না।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নীতিমালায় আরো বলা হয়েছে যে, তাদের বয়স যাচাইয়ের পদ্ধতি, অ্যালগরিদমের অভ্যন্তরীণ কাঠামো এবং শিশু সুরক্ষা সংক্রান্ত সামগ্রিক নীতিমালা ব্যবহারকারী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সাইবার নিরাপত্তা অধিদপ্তরের কাছে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরীক্ষাযোগ্য ও পরীক্ষার উপযোগী হতে হবে।
পুরো প্রক্রিয়াটির নির্ভরযোগ্যতা যাতে সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকেরা সহজে বুঝতে পারেন, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া অভিভাবকদের জন্য এমন কিছু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যা অত্যন্ত স্পষ্ট ও ব্যবহারবান্ধব হয়, যাতে তারা নিজেদের সন্তানদের ডিজিটাল গতিবিধি সহজেই ইতিবাচকভাবে পরিচালনা ও পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
তুরস্কের আইনপ্রণেতারা চলতি বছরের এপ্রিলে যখন এই আইনটি অনুমোদন করেছিলেন, তখন থেকেই অপ্রাপ্তবয়স্কদের ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিধি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব, বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য, বিষণ্নতা এবং অনিরাপদ পরিবেশ নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বহু আন্তর্জাতিক গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছিলেন যে, অবাধ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের কারণে কম বয়সী ছেলেমেয়েরা তাদের স্বাভাবিক বয়সোচিত বিকাশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং নানা ধরনের সাইবার সহিংসতার শিকার হচ্ছে।
তুরস্কের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে বিশেষজ্ঞরা শিশুদের ডিজিটাল সুরক্ষা জোরদার করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। নতুন এই নির্দেশনার ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী বৈশ্বিক ও স্থানীয় বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের বিদ্যমান কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।
সেবা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্মগুলোকে এখন নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের অভ্যন্তরীণ অ্যালগরিদম অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য কোনো ক্ষতিকর বা অনুপযুক্ত উপাদান সুপারিশ করছে না। প্ল্যাটফর্মগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নজরদারি আরো কঠোর করা হবে এবং নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে। আঙ্কারার এই নতুন উদ্যোগটি বিশ্বজুড়ে অন্যান্য দেশগুলোর সাইবার সুরক্ষা নীতিমালা ও শিশুদের অনলাইন অধিকার সুরক্ষার প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করেছে।