সোমবার, অক্টোবর ১২, ২০২৬
২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলায় নিহত এক, আহত এগারো

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:০০ পিএম

রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলায় নিহত এক, আহত এগারো
ছবি : Collected

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত অন্যতম প্রধান এবং ব্যস্ততম আকাশপথের প্রবেশদ্বার, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক অপ্রত্যাশিত এবং ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। সোমবার ভোরে সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এই মর্মান্তিক সংবাদটি নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই বর্বরোচিত হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত একজন নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আরও এগারো জন ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই হামলাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ এবং চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

 

সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। সৌদি আরবের জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশন বা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই ঘটনার তদন্ত এবং উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে।

 

কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, রোববারের এই হামলায় যে ব্যক্তিটি দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন, তিনি সৌদি আরবে বসবাসরত একজন পাকিস্তানি নাগরিক। তার এই অকাল মৃত্যুতে স্থানীয় প্রবাসী সম্প্রদায় এবং তার পরিবারের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

 

একই সাথে হামলায় আহত এগারো জনকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে উদ্ধার করে রিয়াদের নিকটবর্তী বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে।

 

কর্তৃপক্ষ আহতদের দ্রুত সুস্থতা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং তাদের শারীরিক অবস্থার নিয়মিত খোঁজখবর রাখছে। এই ভয়াবহ হামলার প্রভাব কেবল মানুষের জীবনহানির মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত দিক দিয়েও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে।

 

ইয়েমেনের সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রবিবার বিকেলের দিকে একটি অজ্ঞাত প্রকৃতির প্রজেক্টাইল বা বিস্ফোরক বস্তু সরাসরি কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চার নম্বর টার্মিনালে আঘাত হানে।

 

এই প্রচণ্ড আঘাতের পরপরই টার্মিনাল ভবনের ভেতরে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিস এবং জরুরি উদ্ধারকারী দল তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও, ততক্ষণে ভবনের বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, ঠিক কী পরিমাণ বস্তুগত ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।

 

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়টি হলো, এই হামলাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মাত্র এক দিন আগে, অর্থাৎ শনিবার, ঠিক একই বিমানবন্দরে আরেকটি অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক হামলার ঘটনা ঘটেছিল, যা গোটা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিল।

 

সেই ভয়াবহ হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত বারো জন নিরীহ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় এবং তিন শতাধিক মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হন। নিহতদের মধ্যে সৌদি আরবের নিজস্ব নাগরিক ছাড়াও বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন এবং সুদানের নাগরিকরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

 

বিশেষ করে, নিহতদের মধ্যে দুইজন বাংলাদেশি নাগরিকের উপস্থিতি গোটা বাংলাদেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি এবং শোকের বার্তা বয়ে এনেছে। পরপর দুই দিন একই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ ধরনের ভয়াবহ এবং সুপরিকল্পিত হামলা সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আকাশসীমার সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।

 

এই ধারাবাহিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সরাসরি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে। সামরিক জোটের মুখপাত্র এই হামলাগুলোকে সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, বেসামরিক স্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের ওপর এ ধরনের কাপুরুষোচিত আক্রমণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না এবং এর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে।

 

আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী, যুদ্ধকালীন অবস্থাতেও বেসামরিক বিমানবন্দর এবং যাত্রীদের লক্ষ্যবস্তু করা একটি সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ হিসেবে পরিগণিত হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ এই নীতিগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

 

অন্যদিকে, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সামরিক মুখপাত্র টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে শনিবারের হামলার দায় স্বীকার করেছেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তারা সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোকে তাদের সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ঘোষণা করে সাধারণ যাত্রীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

 

হুথিদের দাবি, সৌদি আরব ইয়েমেনের অভ্যন্তরে বিশেষ করে সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যে সামরিক অভিযান চালিয়েছে, তারই প্রতিশোধ হিসেবে এই পাল্টা হামলাগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। এই পারস্পরিক আক্রমণ এবং প্রতিশোধের রাজনীতি গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে এক গভীর খাদের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ভয়াবহ ঘটনার পর নীরব থাকেনি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশগ্রহণ করবে কি না, তা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করছেন বলে জানিয়েছেন।

 

এছাড়াও তুরস্ক, পাকিস্তান এবং মিশরের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো এই হামলার কঠোর ভাষায় নিন্দা জানিয়েছে এবং সৌদি আরবের প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন ও সংহতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। তারা একযোগে জানিয়েছে যে, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর এ ধরনের আক্রমণ কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না এবং অবিলম্বে এই সহিংসতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

 

হামলার পরপরই রিয়াদের জনজীবনে এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেশ কিছু ফ্লাইটের সময়সূচি বাতিল বা পরিবর্তন করা হয়েছে এবং অনেক বিমানকে বিকল্প গন্তব্যে অবতরণ করতে বাধ্য করা হয়েছে।

 

বিমানবন্দর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন রিয়াদ শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সাময়িকভাবে অনলাইন বা দূরশিক্ষণ কার্যক্রমে স্থানান্তরিত করার নির্দেশ দিয়েছে, যাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়।

 

এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলন তাদের পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে, যা সৌদি আরবের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখার দৃঢ় মনোভাবকে প্রতিফলিত করে।

 

পরিশেষে বলা যায়, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরপর দুই দিনের এই রক্তক্ষয়ী হামলা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতা এবং সংঘাতের এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। একজন পাকিস্তানি নাগরিকের মৃত্যু এবং অসংখ্য মানুষের আহত হওয়ার এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, যুদ্ধ ও সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাতে হয় সাধারণ ও নিরীহ মানুষদের।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই অমানবিক পরিস্থিতি নিরসনে আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করা এবং সংঘাতময় পক্ষগুলোকে একটি শান্তিপূর্ণ ও গঠনমূলক আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। তা না হলে এ ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ কেবল বাড়তেই থাকবে, যা সমগ্র বিশ্বের শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার জন্য এক মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

 

- আনাদোলু এজেন্সি