সোমবার প্রদত্ত এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় তিনি এই কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেন এবং স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, আঞ্চলিক দেশগুলোর উচিত যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ও নিষ্ক্রিয় নিরাপত্তা বলয় থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে আসা। কারণ ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা অর্জন করা কখনোই সম্ভব নয়।
ইরানি সামরিক মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের তৈরি করা এক জটিল চোরাবালিতে দিন দিন আরও গভীরভাবে নিমজ্জিত হচ্ছে। এই সংকটময় অচলাবস্থা থেকে নিজেদের উদ্ধার করতে কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে ওয়াশিংটন এখন সামুদ্রিক জ্বালানি চোরাচালানের মতো অনৈতিক ও অবৈধ তৎপরতার আশ্রয় নিচ্ছে।
তবে এই ধরনের সামুদ্রিক দস্যুতা, সম্পদ আত্মসাৎ এবং জ্বালানি পাচারের অপচেষ্টা চালিয়ে কোনো অবস্থাতেই আমেরিকার অবধারিত ও নিশ্চিত পরাজয় ঠেকানো সম্ভব নয় বলে তিনি দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, এ জাতীয় আইনবহির্ভূত পদক্ষেপ কি তাদের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক পতন ঠেকাতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তিনি নিজেই বলেন, এর মাধ্যমে আমেরিকার পরাজয় এড়ানো একেবারেই অসম্ভব।
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও ভৌগোলিক আধিপত্য বিস্তার প্রসঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের অব্যাহত বক্তব্যকে মিথ্যাচার ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন জেনারেল শেকারচি। তিনি বলেন, মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের দেওয়া অসত্য বিবৃতি এবং মনস্তাত্ত্বিক তৎপরতা যুদ্ধক্ষেত্রের প্রকৃত বাস্তবতাকে কোনোভাবেই বদলে দিতে পারবে না।
কোনো ধরণের মনস্তাত্ত্বিক অভিযান বা গণমাধ্যমের ভুয়া প্রচারণা ওয়াশিংটনকে তাদের ব্যর্থ রণকৌশলের ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। বাস্তব রণক্ষেত্রের ফলাফলকে শুধু প্রচারণার আড়ালে ঢেকে রাখা বা কৃত্রিম কোলাহল সৃষ্টি করে পাল্টে দেওয়া অসম্ভব।
মার্কিন প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার সাম্প্রতিক বক্তব্য ও আচরণকে আক্রমণাত্মক আখ্যা দিয়ে ইরানি মুখপাত্র বলেন, তাদের অবাস্তব ও অপরিণামদর্শী আচরণ মূলত ইরানের সুপ্রাচীন সভ্যতা, সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং বীরত্বপূর্ণ জনগণের প্রতি সরাসরি অবমাননা।
তবে এই ধরনের আচরণ কেবল তাদের অভ্যন্তরীণ হতাশা ও দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। একই সাথে এটি ইসলামি ইরানের বীর ও মহৎ জনগণের অটুট মনোবল এবং প্রতিরোধ সংকল্পকে আরও বহুগুণে শক্তিশালী করছে। তিনি উল্লেখ করেন, ইরানি জনগণ যেকোনো বিদেশি হুমকির মুখে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষা করতে সবসময় ঐক্যবদ্ধ এবং অবিচল থেকেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শেকারচি বলেন, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো ইতিমধ্যেই নিজেদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত নিরাপত্তা ছাতা রণক্ষেত্রে কতটা অকার্যকর এবং নিষ্ফল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে সঠিক শিক্ষা নেওয়া উচিত এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সেকেলে ও ব্যর্থ নীতিমালার পেছনে ছুটে কোনো বিপজ্জনক বা মারাত্মক বিপদের মুখে পতিত হওয়া পরিহার করা দরকার।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ‘পচা দড়িতে’ ভর করে চলা মানেই হলো এক গভীর ও ধ্বংসাত্মক খাদে নিজেদের নিক্ষেপ করা। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এই অঞ্চলের দেশগুলোর নিজেদেরই হাতে নিতে হবে।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও প্রস্তুতির ওপর আলোকপাত করে মুখপাত্র জানান, আমেরিকান ও ইহুদিবাদী শত্রু এবং তাদের সহযোগীদের কাছে ইরান অতীতেও বহুবার নিজেদের বীরত্ব ও অপরাজেয় সংকল্প প্রদর্শন করেছে।
বর্তমান সময়ে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বহুগুণ বেশি সামরিক সক্ষমতা ও সর্বোচ্চ প্রস্তুতি অর্জন করেছে। এই বাহিনী যেকোনো মূল্যেই হোক না কেন জাতীয় স্বার্থ, ভৌগোলিক নিরাপত্তা এবং ইসলামি ইরানের অস্তিত্ব অত্যন্ত অবিচলতার সাথে রক্ষা করবে।
প্রয়োজনে শত্রুর যেকোনো অন্যায় আগ্রাসনের বিপরীতে শক্তিশালী প্রতিরোধ ও পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে চূড়ান্ত পরাজয় উপহার দিতে তারা কোনো দ্বিধা করবে না। বক্তব্যের শেষাংশে ইরানের সামরিক মুখপাত্র আবারো পুনর্ব্যক্ত করেন যে, পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইহুদিবাদী শাসনব্যবস্থা যে ধরনের আধিপত্যমূলক শৃঙ্খলা বা কর্তৃত্ব কায়েম করতে চায়, তা আর কখনোই ঘটতে দেওয়া হবে না।
তিনি বাস্তবতার পর্যালোচনা করে বলেন, ওয়াশিংটন বর্তমানে এই অঞ্চলে নিজেদের সৈন্য ও স্বার্থের নিরাপত্তাটুকু নিশ্চিত করতেই মারাত্মকভাবে হিমশিম খাচ্ছে এবং তারা একেবারেই অক্ষম।
যে দেশ নিজের ন্যূনতম নিরাপত্তা বজায় রাখতে পারে না, তারা অন্য কোনো আঞ্চলিক মিত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে-এমন ধারণা পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও অন্তঃসারশূন্য। ফলে সমগ্র অঞ্চলের স্থায়ী শান্তি, অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় পরনির্ভরশীলতা ত্যাগ করে পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধানের পথ বেছে নেওয়াই একমাত্র কার্যকর উপায়।