মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হুথিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক সহায়তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান সৌদির

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৫২ পিএম

হুথিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক সহায়তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান সৌদির
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিনিয়ত ঘটছে নানা নাটকীয় পটপরিবর্তন। এর ধারাবাহিকতায় এবার সামনে এলো এক নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীদের দমনে সৌদি আরবকে সরাসরি সামরিক সহায়তা প্রদানের একটি অত্যন্ত গোপন ও কৌশলগত প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

 

তবে নিজ দেশের সাধারণ জনগণের তীব্র ক্ষোভ ও সম্ভাব্য জনরোষের আশঙ্কায় সেই প্রস্তাব অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন সৌদি আরবের প্রভাবশালী ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান।

 

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম হারেৎজ এক বিশেষ প্রতিবেদনে তাদের নিজস্ব উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এই খবরটি প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচনা করছে।

 

হারেৎজ-এর ওই বিস্তারিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এই গোপন প্রস্তাবটি রিয়াদের কাছে পাঠানো হয়েছিল। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য ছিল হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানের আড়ালে মূলত সৌদি আরবের সঙ্গে একটি শক্ত কূটনৈতিক ও আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা।

 

দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক পরিসরে সমালোচিত নেতানিয়াহু চেয়েছিলেন ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সমর্থন যুগিয়ে সৌদি রাজপরিবারের বিশ্বাস অর্জন করতে। এর মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যতে রিয়াদ ও তেল আবিবের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রকাশ্য কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পথ সুগম করতে চেয়েছিলেন।

 

কিন্তু ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান অত্যন্ত সুকৌশলে এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। কারণ তিনি খুব ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, ফিলিস্তিনে চলমান আগ্রাসনের মধ্যে ইসরায়েলের কাছ থেকে কোনো ধরনের সামরিক বা কৌশলগত সহায়তা গ্রহণ করলে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা দেখা দিতে পারে এবং সাধারণ জনগণ রাজপরিবারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারে।

 

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও জটিল। বিগত কয়েক বছর ধরে হুথিরা প্রায়শই সৌদি আরবের ভূখণ্ডে, বিশেষ করে তাদের তেল শোধনাগার এবং গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনাগুলোতে ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়ে এসেছে।

 

এই হামলাগুলো সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বড় মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর ইয়েমেন ইস্যুতেও রিয়াদ কিছুটা নমনীয় ও কৌশলগত কূটনীতির পথ বেছে নিয়েছে।

 

তারা ইয়েমেনে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তির জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ঠিক এমন একটি সন্ধিক্ষণে ইসরায়েল যখন হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়, তখন সৌদি আরব বুঝতে পারে যে এটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্তের অংশ হতে পারে।

 

ইসরায়েলের সহায়তায় নতুন করে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে জড়ালে ইয়েমেনে চলমান শান্তি প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ভেস্তে যেতে পারে এবং পুরো অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়তে পারে।

 

সৌদি আরবের মতো রক্ষণশীল এবং মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী একটি দেশে ফিলিস্তিন ইস্যুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সাধারণ সৌদি নাগরিকদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি রয়েছে গভীর ও ঐতিহাসিক সহানুভূতি। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বর্তমানে তার দেশের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানোর জন্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন।

 

এই রূপকল্প বাস্তবায়নের জন্য দেশে অভ্যন্তরীণ শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন বজায় রাখা তার জন্য একান্ত অপরিহার্য। এমন একটি স্পর্শকাতর সময়ে, যখন গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক অভিযানের কারণে হাজার হাজার নিরীহ ফিলিস্তিনির প্রাণহানি ঘটছে, তখন ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো ধরনের প্রকাশ্য বা গোপন সখ্যতা সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

তাই রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে প্রিন্স সালমান এই প্রলোভনমূলক প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দিয়েছেন। এই ঘটনার পেছনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের কিছুটা পেছনে ফিরে তাকাতে হবে।

 

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি মধ্যস্থতায় আব্রাহাম চুক্তি নামক একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।

 

এই চুক্তির আওতায় আরব বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো এবং সুদান আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের বৈরিতা ভুলে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করে।

 

এই চুক্তির পর থেকেই ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী, ধনী এবং ইসলামি বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র সৌদি আরবকে এই চুক্তির আওতায় নিয়ে আসা।

 

কারণ, পবিত্র স্থানগুলোর রক্ষক হিসেবে সৌদি আরব যদি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়, তবে তা সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ইসরায়েলের বৈধতা আদায়ের ক্ষেত্রে একটি অভাবনীয় ও চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে বিবেচিত হবে।

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই এই ঐতিহাসিক অর্জনের জন্য নিরলস কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন।

 

এমনকি ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে পরিস্থিতি এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছিলেন সৌদি আরব এবং ইসরায়েল আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপনের একেবারে দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে।

 

উভয় দেশের মধ্যে গোপন কূটনৈতিক আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছিল। কিন্তু সেই বছরের অক্টোবরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক দৃশ্যপট সম্পূর্ণভাবে পাল্টে যায়। গাজাভিত্তিক ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে এবং বিভিন্ন বসতিতে আকস্মিক হামলা চালায়।

 

এই হামলার পরপরই ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং তীব্র মাত্রায় সামরিক অভিযান শুরু করে। ওই ঘটনার পর ইসরায়েল-সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের যে প্রক্রিয়াটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে এবং সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায়।

 

গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার সামরিক অভিযান, ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ এবং বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা আরব বিশ্বসহ সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।

 

এহেন ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে সৌদি আরবের পক্ষে ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি কেবল রাজনৈতিকভাবেই অসম্ভব হয়ে ওঠেনি, বরং এটি তাদের নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও চরম সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক কার্যক্রমে যখন প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তখন রিয়াদ কোনোভাবেই তেল আবিবের সঙ্গে হাত মেলাতে পারে না, এই বার্তাটিই মূলত সৌদি নেতৃত্ব বিশ্ববাসীকে দিতে চেয়েছে।

 

ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের বিনিময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো আপসকামিতায় যাবে না বলে সৌদি আরব তাদের অনড় অবস্থান পরিষ্কার করেছে। সৌদি আরব পরবর্তীতে অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাদের শর্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছে।

 

রিয়াদ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, ইসরায়েল যদি সত্যিই সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক স্থাপন বা স্বাভাবিকীকরণের স্বপ্ন দেখে, তবে সবার আগে তাদেরকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও পূর্ণাঙ্গ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান পথ তৈরি করতে হবে।

 

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানা অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না বলে সৌদি শীর্ষ নেতৃত্ব দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেছে।

 

এই কঠোর শর্তের মাধ্যমেই মূলত সৌদি আরব প্রমাণ করেছে যে, আঞ্চলিক রাজনীতিতে তারা তাদের ঐতিহ্যবাহী অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেনি। একই সঙ্গে হুথিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক সহায়তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান তার দেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার বিষয়টিকেই সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিয়েছেন।

 

- মিডেল ইস্ট আই