মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিরাপত্তা শঙ্কায় সালমানের অবস্থান বদল, রিয়াদে থমথমে পরিস্থিতি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:২২ পিএম

নিরাপত্তা শঙ্কায় সালমানের অবস্থান বদল, রিয়াদে থমথমে পরিস্থিতি
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনা এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের লাগাতার ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলার পরিপ্রেক্ষিতে নিজস্ব নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কায় পড়েছেন সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান।

 

উদ্ভূত এই ভয়াবহ নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তিনি নির্দিষ্ট কোনো এক প্রাসাদে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করছেন না। বরং প্রতিনিয়ত নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে এক প্রাসাদ থেকে অন্য প্রাসাদে আশ্রয় নিচ্ছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

 

সোমবার (১২ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল তাদের এক বিশেষ ও চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে, যা মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্ব গণমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

 

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ওই বিস্তৃত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার মাত্রা ও তীব্রতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ক্রমবর্ধমান হামলার মুখে নিজেদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি রাজপরিবার ও প্রশাসন নজিরবিহীন সব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

 

বিশেষ করে ৪১ বছর বয়সী ক্রাউন প্রিন্স এবং সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ শাসক মোহাম্মদ বিন সালমানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি বর্তমানে রিয়াদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি সাধারণ প্রাসাদগুলো এড়িয়ে চলছেন এবং এমন সব দুর্ভেদ্য প্রাসাদে আশ্রয় নিচ্ছেন যেগুলো অত্যাধুনিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে মোড়ানো এবং যেখানে শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে।

 

সংবাদমাধ্যমটির তথ্য অনুযায়ী, কেবল প্রাসাদের পরিবর্তনই নয়, ক্রাউন প্রিন্সের সার্বক্ষণিক পাহারায় মোতায়েন করা হয়েছে বিশেষভাবে বাছাই করা একটি অত্যন্ত সুদক্ষ ও চৌকস এলিট নিরাপত্তাবাহিনী।

 

এই বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের একমাত্র দায়িত্ব হলো যেকোনো মূল্যে প্রিন্সের প্রাণরক্ষা এবং সম্ভাব্য যেকোনো ড্রোন বা মিসাইল হামলা থেকে তাকে সুরক্ষিত রাখা। রাজপরিবারের এই শীর্ষ নেতাকে গত মঙ্গলবার সর্বশেষবারের মতো জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল।

 

ওই দিন তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে একটি রক্তদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সেই দিনের পর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে কোনো রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি, যা তার নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া জল্পনা-কল্পনাকে আরও জোরালো করে তুলেছে।

 

সৌদি আরবের এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সূচনা মূলত গত শনিবারের ভয়াবহ হামলার পর থেকে। ওই দিন সৌদি আরব গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও ধ্বংসাত্মক হামলার শিকার হয়।

 

ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীরা সরাসরি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে শক্তিশালী ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করে। এই আকস্মিক ও ভয়াবহ মিসাইল হামলায় অন্তত ১২ জন নিরীহ মানুষ মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৩০৯ জন।

 

নিহতদের মধ্যে দুইজন বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন, যা এই হামলাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের কাছেও অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, যার ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি কোনো সাধারণ হামলা নয়। সৌদি আরবের শীর্ষ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রকাশ্য সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় কোনো আরব দেশে এটিই ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও ভয়াবহ প্রাণঘাতী ঘটনা।

 

এই হামলা প্রমাণ করেছে যে, হুথি বিদ্রোহীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সংঘবদ্ধ এবং তাদের হাতে থাকা সামরিক সরঞ্জাম সৌদি আরবের মতো শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দেশের জন্যও চরম হুমকিস্বরূপ।

 

শনিবারের ওই প্রাণঘাতী হামলার পর থেকেই রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ততম এই বিমানবন্দরটি এখনো পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা-সবকিছুই একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে।

 

পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, হুথি বিদ্রোহীরা গত মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে এই গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম বিমানবন্দরটিতে চারবার জোরালো হামলা চালিয়েছে। বিমানবন্দর লক্ষ্য করে এই ধারাবাহিক হামলা সৌদি আরবের আকাশপথের নিরাপত্তাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং দেশের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বিরাট ধাক্কা দিয়েছে।

 

এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের শীর্ষ নেতৃত্ব তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, হুথি বিদ্রোহীরা যেভাবে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও সাধারণ মানুষের ওপর ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে, তার জবাবও হবে ঠিক সমান মাত্রার এবং অত্যন্ত গুরুতর।

 

সৌদি আরব এই জঘন্য হামলার কড়া প্রতিশোধ নিতে পিছপা হবে না বলে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তার এই বক্তব্য থেকে এটি সহজেই অনুমেয় যে, আগামী দিনগুলোতে ইয়েমেনে হুথি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে সৌদি জোটের সামরিক অভিযান আরও জোরদার হতে চলেছে, যা পুরো অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে নতুন করে খাদের কিনারে ঠেলে দিতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের অভ্যন্তরে এই ধরনের ধারাবাহিক ও সুনির্দিষ্ট হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এক নতুন মাত্রার সংকট তৈরি করেছে। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের মতো একজন প্রভাবশালী নেতার নিরাপত্তা নিয়ে যখন এমন সংশয় তৈরি হয়, তখন সেটি কেবল সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

 

সব মিলিয়ে সৌদি আরবের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে এবং যেকোনো সময় নতুন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বিশ্ব সম্প্রদায় এখন গভীর উদ্বেগের সঙ্গে রিয়াদের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ক্রাউন প্রিন্সের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে।

 

- ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল