সামরিক আগ্রাসন ও যুদ্ধবিগ্রহের সময় যারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিংবা কৌশলগত কারণে একটি দেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে, তাদেরকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে বলে অত্যন্ত জোরালো ও দ্ব্যর্থহীন দাবি জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জোর দিয়ে বলেছেন যে, যেকোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশকে রক্ষা করা এবং ওই ভূখণ্ড ও দেশের সাধারণ মানুষের শত্রুদের তাদের মানবতাবিরোধী ও প্রকৃতিবিরোধী কৃতকর্মের জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করানো বর্তমান সময়ের একটি অনস্বীকার্য ও অত্যন্ত জরুরি বাস্তবতা।
পরিবেশের ওপর যুদ্ধের এই ভয়াবহ প্রভাবকে আর কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলে তিনি বিশ্বনেতৃবৃন্দের প্রতি প্রচ্ছন্ন বার্তা দিয়েছেন। ইরানের পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগে সম্প্রতি আয়োজিত প্রথম আন্তর্জাতিক ‘ইকোসাইড’ বা পরিবেশবিধ্বংসী অপরাধ বিষয়ক এক বিশেষ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
পার্সটুডে এবং মেহের সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে দেওয়া নিজ বক্তব্যের একাংশ সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি পরবর্তীতে একটি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে বিশ্ববাসীর সামনে নিজেদের রাষ্ট্রীয় অবস্থান আরও সুনির্দিষ্ট ও জোরালোভাবে পরিষ্কার করেছেন।
ওই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, যুদ্ধের ডামাডোলে পরিবেশ ও প্রকৃতির যে অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করা হয়, তা আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের প্রেক্ষাপটে একটি ‘নীরব অপরাধ’ হিসেবে পরিগণিত হয়।
কারণ, যুদ্ধের সময় তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের মৃত্যু, রক্তপাত বা বিশাল ভবনের ধ্বংসস্তূপ খুব সহজেই বিশ্ববাসীর চোখে পড়লেও, পরিবেশের ওপর যে মারাত্মক, বিষাক্ত ও সুদূরপ্রসারী ক্ষতি সাধিত হয়, তা তাৎক্ষণিকভাবে অনুধাবন করা যায় না।
কিন্তু এই নীরব অপরাধের সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ পরিণতি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এবং যুগের পর যুগ ধরে এর চরম বিরূপ প্রভাব প্রকৃতি ও নিরীহ মানুষকে বহন করতে হয়।
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং ইরানের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি তার দেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক শক্তির সম্ভাব্য ও চলমান সামরিক আগ্রাসনের কঠোর সমালোচনা করেন।
তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সরকারের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করেন যে, প্রিয় মাতৃভূমি ইরানের বিরুদ্ধে এই দুই পরাশক্তির সামরিক হামলা এবং বিশেষ করে দেশটির অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ তেল এবং জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার যে ক্রমাগত হুমকি প্রদান ও আগ্রাসন চালানো হচ্ছে, তার ফলে সমগ্র অঞ্চলে এক অত্যন্ত গুরুতর, দীর্ঘমেয়াদি ও নজিরবিহীন পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
আধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহার করে একটি দেশের জ্বালানি ও তেল স্থাপনায় যখন শক্তিশালী সামরিক হামলা চালানো হয়, তখন সেখান থেকে নির্গত বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত রাসায়নিক, জ্বলন্ত অপরিশোধিত তেল এবং আকাশ ঢাকা কালো ধোঁয়া পুরো এলাকার বায়ু, মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে তোলে।
এই ধরনের পরিকল্পিত হামলা কেবল একটি স্বাধীন দেশের অর্থনীতিকেই পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করে না, বরং এটি বৃহত্তর অর্থে পুরো অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত।
পরিবেশের ওপর এই ধরনের সামরিক আগ্রাসনের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ও সামাজিক বিপর্যয়ের দিকগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু বিষয় উত্থাপন করেছেন।
তিনি বলেন, অপরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসব সামরিক হামলার ফলে যে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়, তা সরাসরি দেশের সাধারণ ও নিরীহ মানুষের স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার মানকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
বাতাসে মিশে থাকা বিষাক্ত গ্যাস ও পানিতে মিশ্রিত রাসায়নিকের প্রভাবে দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট, ক্যানসারসহ নানা জটিল, বংশগত ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এর পাশাপাশি একটি দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ, যেমন-উর্বর কৃষিজমি, সুপেয় পানির বিশাল উৎস, প্রাকৃতিক বনাঞ্চল এবং মহামূল্যবান জীববৈচিত্র্য সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসের সম্মুখীন হয়, যা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেও কোনো দেশের পক্ষেই রাতারাতি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও অমানবিক বিষয়টি হলো, এই ধরনের পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড কেবল বর্তমান প্রজন্মের জন্যই ক্ষতিকর নয়, বরং এটি আগামী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি সুন্দর, দূষণমুক্ত ও সুস্থ পরিবেশে বসবাস করার যে জন্মগত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার রয়েছে, তাকেও চরমভাবে ভূলুণ্ঠিত করে।
আন্তর্জাতিক আইন, জেনেভা কনভেনশন ও বৈশ্বিক রীতিনীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে ইরানের শীর্ষ এই কূটনীতিক বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, আধুনিক বিশ্বে ‘ইকোসাইড’ বা ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ হত্যাকে মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে পরিবেশকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা বা শত্রুপক্ষকে ভাতে-পানিতে মারার উদ্দেশ্যে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আক্রমণ চালানো আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং তা কোনোভাবেই সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সামরিক সংঘাতের উত্তেজনার মধ্যেও পরিবেশ সুরক্ষার যে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, আগ্রাসী রাষ্ট্রগুলোকে তা মেনে চলতে বাধ্য করার জন্য তিনি বৈশ্বিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থাগুলোর প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
তার মতে, সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পরিবেশকে রক্ষা করার সংগ্রামটি কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয় নয়, বরং এটি সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার বৃহত্তর লড়াইয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তাই এই ভূখণ্ড এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রাকৃতিক পরিবেশের চরম ক্ষতিসাধনকারী শত্রুদের তাদের জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য আন্তর্জাতিক জবাবদিহির আওতায় আনা কেবল একটি প্রয়োজনই নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের একটি অন্যতম প্রধান শর্ত।
সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি অত্যন্ত দৃঢ়, আবেগময় ও কড়া ভাষায় আগ্রাসী শক্তিগুলোর প্রতি একটি সুস্পষ্ট ও অবিচল সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন।
গভীর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং নিজ মাতৃভূমির পরিবেশ, সম্পদ ও সাধারণ মানুষের ওপর হওয়া যেকোনো অন্যায়ের চরম প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “আমরা ক্ষমা করব না, ভুলেও যাব না!”
তার উচ্চারিত এই একটিমাত্র শক্তিশালী বাক্যের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি এক অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং সংবেদনশীলতা প্রতিফলিত হয়েছে, অন্যদিকে আগ্রাসী শক্তিগুলোর প্রতি এটি একটি অত্যন্ত শক্ত, আপসহীন ও সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক বার্তাও বহন করে।
এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, ইরান তার পবিত্র ভূমি, নিরীহ জনগণ এবং অমূল্য প্রকৃতির ওপর হওয়া কোনো ধরনের আগ্রাসন বা ধ্বংসযজ্ঞকেই বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেবে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এসব জঘন্য অপরাধের সুষ্ঠু বিচার এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তারা তাদের আইনি ও কূটনৈতিক লড়াই সর্বস্তরে অব্যাহত রাখবে।
সামরিক আগ্রাসনের নামে পরিবেশ বিধ্বংসী এসব অমার্জনীয় অপরাধের স্মৃতি ও ক্ষত ইরানি জাতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিজেদের হৃদয়ে ধারণ করবে এবং প্রকৃত অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর এই ন্যায্য বিচার ও প্রতিবাদের অধিকার থেকে তারা কখনোই পিছু হটবে না।