মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর সামরিক অভিযান ‘ডন অব ইয়েমেন’

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:২৫ পিএম

ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর সামরিক অভিযান ‘ডন অব ইয়েমেন’
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সংঘাতপূর্ণ দেশ ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর চলমান সামরিক অভিযান এক নতুন এবং চূড়ান্ত মাত্রা লাভ করেছে। ইয়েমেনের সেনাবাহিনী এবং তাদের সমর্থক জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দেশটির পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলীয় রণক্ষেত্রে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তারা তাদের আক্রমণাত্মক সামরিক তৎপরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে।

 

চলতি মাসের শুরুতে শুরু হওয়া ‘ডন অব ইয়েমেন’ বা ‘ইয়েমেনের ভোর’ শীর্ষক এই সুপরিকল্পিত এবং বৃহত্তর সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে সরকারি বাহিনী হুথিদের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে ধারাবাহিক এবং ধ্বংসাত্মক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

মঙ্গলবার সরকারি বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে যে, চলমান এই তীব্র সামরিক অভিযানের ফলে অন্তত এক হাজার দুইশ হুথি যোদ্ধা নিহত বা নিষ্ক্রিয় হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করছে। ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীর আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজেদ আব্দুল্লাহ আল-নাধিব এই অভিযানের বিস্তারিত তথ্য সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেছেন।

 

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বাহিনী অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং সমন্বিতভাবে হুথি বিদ্রোহীদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। তিনি জানান, আকাশ এবং স্থলপথের সমন্বয়ে সরকারি বাহিনী মোট দুই হাজার দুইশটি সফল হামলা পরিচালনা করেছে।

 

এই ব্যাপক মাত্রার হামলায় অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন, দূরপাল্লার ফিল্ড আর্টিলারি, রকেট লঞ্চার এবং বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত স্নাইপার ইউনিটগুলোকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

 

সামরিক মুখপাত্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, তাদের এই ধারাবাহিক এবং সুনির্দিষ্ট হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল হুথিদের কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার বা নিয়ন্ত্রণকক্ষ, মজবুত সামরিক দুর্গ, গুলি ছোড়ার নির্দিষ্ট অবস্থান, পর্যবেক্ষণ এবং নজরদারির চৌকি, সেনা সমাবেশের স্থান, অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিশাল মজুত এবং তাদের রসদ সরবরাহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো। এই ধরনের সমন্বিত হামলার মাধ্যমে মূলত হুথিদের সামরিক এবং কৌশলগত মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

 

বিশেষ করে ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশের রণক্ষেত্রে সরকারি বাহিনীর কৌশলগত সফলতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সামরিক মুখপাত্র জানান, তাইজ অঞ্চলে হুথিদের সামরিক বহর এবং অতিরিক্ত সেনা সহায়তার ওপর অত্যন্ত নিবিড় এবং কেন্দ্রীভূত হামলা চালানো হয়েছে।

 

এই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক হামলার ফলে হুথি বিদ্রোহীরা তাদের সামরিক বাহিনী এবং রসদপত্র পুনরায় সংগঠিত করার ক্ষেত্রে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির যে পরিসংখ্যান সরকারি বাহিনীর হাতে এসে পৌঁছেছে, তা হুথিদের জন্য অত্যন্ত বড় একটি ধাক্কা।

 

ধারণা করা হচ্ছে, এই সব অঞ্চলে অন্তত এক হাজার দুইশ হুথি যোদ্ধাকে যুদ্ধের ময়দান থেকে চিরতরে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি রণক্ষেত্রের বিভিন্ন ফ্রন্টে হুথিদের ব্যবহৃত চারশ চল্লিশটিরও বেশি সামরিক যান এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র হয় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, নতুবা এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে যা আর ব্যবহারযোগ্য নেই।

 

সামরিক সরঞ্জামের এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হুথিদের যুদ্ধ করার সক্ষমতাকে অনেকটাই দুর্বল করে দেবে বলে সরকারি বাহিনী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। যুদ্ধের ভয়াবহতার পাশাপাশি মানবিক এবং বেসামরিক সুরক্ষার দিকটিও এই অভিযানে সমানভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

সামরিক বাহিনীর দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় রণক্ষেত্রে যেসব এলাকা হুথিদের দখল থেকে সরকারি বাহিনী সদ্য পুনরুদ্ধার করেছে, সেখানে সামরিক বাহিনীর বিশেষ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মাইন অপসারণের কাজ নিরলসভাবে চালিয়ে যাচ্ছে।

 

যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া সাধারণ বেসামরিক নাগরিকরা যাতে সম্পূর্ণ নিরাপদে এবং নির্বিঘ্নে তাদের নিজেদের বসতভিটায় ফিরে আসতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্যই রাস্তাঘাট এবং গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াত পথগুলোকে সুরক্ষিত করার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হয়েছে।

 

হুথিদের পুঁতে রাখা হাজার হাজার মাইন সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য যে মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছিল, তা অপসারণের মাধ্যমে সরকার মূলত সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের পাশাপাশি মানবাধিকার রক্ষার প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা প্রমাণ করার চেষ্টা করছে।

 

ইয়েমেনের বর্তমান এই সামরিক উত্তেজনার পটভূমি অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘস্থায়ী। মূলত সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের জোরালো সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনী এবং ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক এবং সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটেই এই সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সংঘটিত হচ্ছে।

 

ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ পুনরায় নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া এবং হুথিদের দখলে থাকা বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই চলতি মাসের শুরুতে সরকারি বাহিনী এই ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামক সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের সূচনা করে।

 

এর মাধ্যমে সরকার প্রমাণ করতে চাইছে যে তারা দেশের সার্বিক নিরাপত্তা এবং অখণ্ডতা রক্ষায় যেকোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের শিকড় মূলত ২০১৪ সালে নিহিত।

 

ওই বছর হুথি বিদ্রোহীরা অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং এর আশপাশের বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়, যার ফলে দেশটির বৈধ সরকার কার্যত ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং গভীর রাজনৈতিক সংকটের সূচনা হয়।

 

এর ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৫ সালের মার্চ মাসে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি দেশের সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী সামরিক জোট ইয়েমেনের এই গৃহযুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে।

 

সেই থেকে ইয়েমেন কার্যত একটি প্রক্সি যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং লাখ লাখ মানুষ চরম মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। সাম্প্রতিক এই সর্বাত্মক যুদ্ধ পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির সম্পূর্ণ পতন।

 

জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষের মধ্যে যে একটি আপেক্ষিক শান্তির পরিবেশ এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, চলতি বছরের জুলাই মাসে তা আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে পড়ে।

 

যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই মূলত জুলাই মাস থেকে ইয়েমেনে এই নতুন মাত্রার সামরিক উত্তেজনা এবং ভয়াবহ রক্তপাতের সূচনা হয়েছে, যা এখন ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানের মাধ্যমে চরম আকার ধারণ করেছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইয়েমেনের এই ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত এবং এর ফলে সৃষ্ট মানবিক সংকট নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তবে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী তাদের দেশের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের এই সামরিক সংগ্রাম তাদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত রাখার ব্যাপারে অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

 

- আনাদোলু এজেন্সি