বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬
২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইয়েমেনে চরম খাদ্যসংকট, ৮০ শতাংশ মানুষের বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:০২ পিএম

ইয়েমেনে চরম খাদ্যসংকট, ৮০ শতাংশ মানুষের বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র ইয়েমেনে মানবিক সংকট এক ভয়াবহ এবং অকল্পনীয় রূপ ধারণ করেছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সম্প্রতি এক অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, দেশটির প্রতি দশজন নাগরিকের মধ্যে আটজনই তাঁদের দৈনন্দিন মৌলিক খাদ্য চাহিদা পূরণে চরম সংগ্রামের সম্মুখীন হচ্ছেন।

 

অর্থাৎ, ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ বর্তমানে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম খাবারের সংস্থান করতে গিয়ে সীমাহীন কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মধ্যে দেশব্যাপী চলমান এবং ক্রমবর্ধমান সশস্ত্র সংঘাতের কারণেই মূলত এই মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইয়েমেনের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল, তবে ডব্লিউএফপি-এর এই সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান পরিস্থিতি কতটা শোচনীয় তার একটি স্পষ্ট ও ভয়ংকর চিত্র বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে।

 

ডব্লিউএফপি তাদের প্রকাশিত এই বিশদ প্রতিবেদনে ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশের বর্তমান অবস্থাকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রতিবেদনে অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, তাইজ অঞ্চলে চলমান তীব্র লড়াই এবং সামরিক অবরোধের কারণে প্রায় আট লাখ সাধারণ মানুষের কাছে জীবনরক্ষাকারী মানবিক খাদ্য সহায়তা পৌঁছানো সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে।

 

যুদ্ধের ভয়াবহতায় এই বিস্তীর্ণ এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর প্রবেশাধিকার মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জাতিসংঘের এই অঙ্গসংস্থার তথ্যমতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত পুরো ইয়েমেনের মধ্যে তাইজ শহরের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মাত্রা বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

 

এই শহরের লাখ লাখ শিশু, নারী ও বয়স্ক মানুষ প্রতিদিন অর্ধাহারে বা অনাহারে দিনাতিপাত করছেন। গোলাগুলি এবং বিমান হামলার ভয়ে সাধারণ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বের হতে পারছেন না, আবার ঘরেও মজুত নেই কোনো খাবার। এ এক অবর্ণনীয় মানবিক ট্র্যাজেডি, যা আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

ইয়েমেনের এই চরম খাদ্যসংকট এবং মানবিক বিপর্যয়ের শেকড় প্রোথিত রয়েছে দেশটির দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের গভীরে। ২০১৪ সালের শেষের দিকে যখন হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে নেয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে, তখন থেকেই এই ভয়াবহ সংঘাতের সূচনা।

 

পরবর্তীকালে ২০১৫ সালে বিদেশি সামরিক জোট ইয়েমেন সরকারের পক্ষে এই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করলে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করে। বছরের পর বছর ধরে চলা এই নিরন্তর যুদ্ধে ইয়েমেনের জাতীয় অর্থনীতি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, স্থানীয় মুদ্রা মান হারিয়েছে এবং বেকারত্ব চরম আকার ধারণ করেছে।

 

খাদ্যপণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল এই দেশটিতে যুদ্ধের কারণে বন্দর এবং প্রধান প্রধান সরবরাহ পথগুলো অবরুদ্ধ বা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা একেবারেই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বাজারে যে সামান্য পরিমাণ খাবার পাওয়া যায়, তার দামও আকাশচুম্বী, যা সাধারণ ইয়েমেনিদের পক্ষে কেনা একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

খাদ্যসংকটের এই ভয়াবহতার সবচেয়ে নির্মম শিকার হচ্ছে ইয়েমেনের নিরপরাধ শিশুরা এবং নারীরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ডব্লিউএফপি-এর যৌথ মূল্যায়নে বারবার উঠে এসেছে যে, ইয়েমেনে লাখ লাখ শিশু বর্তমানে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।

 

অপুষ্টির কারণে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং পানিবাহিত ও সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন অসংখ্য শিশুর মৃত্যু ঘটছে। অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদানকারী মায়েরাও পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাবে ধুঁকছেন, যার ফলে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

 

অর্ধেকেরও বেশি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ধ্বংস হয়ে গেছে বা ওষুধের অভাবে বন্ধ হয়ে পড়েছে। এই ভয়াবহ স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সংকটের মাঝে পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা না পৌঁছালে ইয়েমেনে এমন এক দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে, যা গোটা বিশ্বকে লজ্জিত করবে বলে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে আসছেন।

 

এমন একটি চরম বৈরী ও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

তবে তাদের এই মানবিক কার্যক্রম প্রতিনিয়ত অসংখ্য বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। একদিকে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর অসহযোগিতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত তহবিলের মারাত্মক ঘাটতি-সব মিলিয়ে ডব্লিউএফপি-এর জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

অনেক সময়ই যুদ্ধক্ষেত্র অতিক্রম করে ত্রাণবাহী ট্রাকগুলো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। ত্রাণকর্মীদের জীবনের নিরাপত্তাও এখানে পদে পদে বিঘ্নিত হচ্ছে। তা সত্ত্বেও, জাতিসংঘ এই অঞ্চলে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।

 

সংস্থাটির পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বারবার জরুরি তহবিলের আবেদন জানানো হচ্ছে, যাতে ইয়েমেনের এই অসহায় মানুষগুলোকে অনাহারের হাত থেকে রক্ষা করা যায়। ইয়েমেনের এই চলমান ট্র্যাজেডি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং এটি সমগ্র মানবজাতির বিবেকের কাছে একটি বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইয়েমেনে শান্তি ফিরিয়ে আনা ছাড়া এই বিশাল মানবিক সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে অবিলম্বে যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে বসানোর জন্য আরও জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

 

একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং নির্বিঘ্নে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ সুগম করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ যুদ্ধ চায় না, তারা চায় দুবেলা দুমুঠো খাবার খেয়ে শান্তিতে বাঁচতে।

 

বিশ্ব সম্প্রদায় যদি এখনই এই বিষয়ে কার্যকর ও ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে ইয়েমেনের মাটি এক অকল্পনীয় মানবিক বিপর্যয়ের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে, যার দায় কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব হবে না।

 

তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে উঠে ইয়েমেনের ক্ষুধার্ত মানুষের কান্না শুনতে হবে এবং জরুরি ভিত্তিতে জীবনরক্ষাকারী সহায়তা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর উচিত ইয়েমেন সংকট সমাধানে নিজেদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব পালন করা।

 

মানবিক ত্রাণ সহায়তার ওপর থেকে সকল প্রকার অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। ইয়েমেনের এই চরম খাদ্যসংকট আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আধুনিক সভ্যতার যুগেও সংঘাত ও রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে কীভাবে অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

 

ইয়েমেনের আট লাখ মানুষ, যারা আজ তাইজ প্রদেশে অবরুদ্ধ অবস্থায় খাদ্যের জন্য হাহাকার করছেন, তারা নিছক কোনো পরিসংখ্যান নন; তারা আমাদেরই মতো রক্তমাংসের মানুষ। ডব্লিউএফপি-এর এই প্রতিবেদনটি মূলত গোটা বিশ্বের জন্য একটি জরুরি সতর্কবার্তা।

 

এই সতর্কবার্তাকে অবহেলা করলে ইয়েমেনের পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে, যেখান থেকে ফিরে আসা আর কখনোই সম্ভব হবে না। তাই সময় থাকতে ইয়েমেনের জনগণের জীবন রক্ষার্থে বৈশ্বিক সংহতি এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

 

- আল জাজিরা