গত বুধবার এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিতে ইরানের নিক্ষিপ্ত শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র এবং চালকবিহীন বিমান বা ড্রোনের ভয়াবহ আঘাতে একটি মালবাহী বা কন্টেইনার জাহাজ এবং একটি বৃহদাকার পণ্যবাহী জাহাজ বা বাল্ক ক্যারিয়ার সম্পূর্ণভাবে সাগরের বুকে তলিয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য এই ঘটনা একটি গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সিঙ্গাপুর এবং জাতিসংঘের মেরিটাইম বা সামুদ্রিক বিষয়ক সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমের কাছে এই দুটি জাহাজডুবির রোমহর্ষক তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
এই ঘটনার পর থেকে ওই অঞ্চলে চলাচলকারী অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নাবিকদের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এক নজিরবিহীন হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির উত্তাল জলরাশিতে ডুবে যাওয়া এই দু’টি জাহাজের নাম হলো ‘জিএফএস প্রাইড’ এবং ‘কেপ দাউ’। এর মধ্যে জিএফএস প্রাইড হলো সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি অপেক্ষাকৃত ছোটো আকারের মালবাহী বা কন্টেইনার জাহাজ, যা মূলত আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল।
অন্যদিকে, সাগরের বুকে তলিয়ে যাওয়া দ্বিতীয় জাহাজটি অর্থাৎ বাল্ক ক্যারিয়ার ‘কেপ দাউ’ ছিল ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দ্বীপরাষ্ট্র অ্যান্টিগা ও বারবুদার পতাকাবাহী একটি বৃহদাকার নৌযান। সিঙ্গাপুরের সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল ও বন্দর কর্তৃপক্ষ, যা সংক্ষেপে এমপিএ নামে পরিচিত, গত বুধবার এক আনুষ্ঠানিক এবং বিস্তারিত বিবৃতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়েছে যে, হামলার শিকার হওয়ার সময় সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী জিএফএস প্রাইড জাহাজটিতে মোট একুশ জন অভিজ্ঞ নাবিক অবস্থান করছিলেন।
অত্যন্ত সৌভাগ্যবশত, এই ভয়াবহ ও আকস্মিক প্রাণঘাতী হামলার পরও তাদের কেউই গুরুতর আহত হননি। একটি দ্রুতগতির এবং অত্যন্ত সুসমন্বিত উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে বিপন্ন এই একুশ জন নাবিকের সবাইকেই নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে সিঙ্গাপুরের কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
অন্যদিকে, অ্যান্টিগা ও বারবুদার পতাকাবাহী বৃহদাকার জাহাজ কেপ দাউ-এর করুণ পরিণতি সম্পর্কে জাতিসংঘের জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা পর্যবেক্ষণ বিষয়ক অঙ্গসংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন বা আইএমও অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এবং বেদনাদায়ক তথ্য প্রদান করেছে।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, কেপ দাউ জাহাজটি গত তেইশে সেপ্টেম্বর হরমুজ প্রণালিতে প্রথমবার এক ভয়াবহ হামলার শিকার হয়ে সম্পূর্ণ অচল ও ভাসমান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।
সেই সময় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা ড্রোনের সরাসরি আঘাতে জাহাজটিতে কর্মরত একজন নিরীহ নাবিক অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়েছিলেন, যা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক শ্রমিকদের নিরাপত্তার চরম অভাবকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
সেই সময়কার হামলায় নিহত নাবিক ছাড়া বাকি সকল নাবিককে অবশ্য সফলভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। সাগরের বুকে দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ ধরে পরিত্যক্ত ও অচল অবস্থায় ভাসতে থাকা সেই ক্ষতবিক্ষত জাহাজটি শেষ পর্যন্ত গত বুধবারের ধারাবাহিক হামলার পর আর টিকে থাকতে না পেরে হরমুজ প্রণালির অতল গহ্বরে চিরতরে ডুবে যায়।
জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা আইএমও-এর সংরক্ষিত তথ্যের গভীর বিশ্লেষণ থেকে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের আটাশে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান সাম্প্রতিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের অব্যাহত হামলার কারণে হরমুজ প্রণালিতে এ পর্যন্ত মোট তিনটি বৃহৎ বাণিজ্যিক জাহাজ সম্পূর্ণভাবে ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটল।
সামুদ্রিক বাণিজ্যের এই অন্ধকার অধ্যায়ে ডুবে যাওয়া এই জাহাজগুলোর মধ্যে ‘জিএফএস প্রাইড’ এবং ‘কেপ দাও’ হলো যথাক্রমে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দুর্ভাগ্যবান নৌযান। এই ধরনের ধারাবাহিক হামলা আন্তর্জাতিক জলসীমায় স্বাধীনভাবে নৌ চলাচলের যে মৌলিক অধিকার রয়েছে, তার ওপর এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
সিঙ্গাপুরের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ এমপিএ তাদের বিবৃতিতে এই বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালীতে নিরীহ বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর অব্যাহত এই সামরিক হামলায় তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং আতঙ্কিত।
কর্তৃপক্ষের মতে, এ ধরনের হামলা শুধু উস্কানিমূলকই নয়, বরং এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের এক চরম ও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি ‘মারিস্কস’ গত বুধবার এই চলমান সংকট নিয়ে তাদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের বিশ্লেষণে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঘটে যাওয়া এসব প্রাণঘাতী ঘটনা হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী নিরীহ বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর বিদ্যমান এবং ক্রমবর্ধমান হুমকিকে আরও অনেক বেশি স্পষ্ট ও ভয়াবহ রূপে তুলে ধরেছে।
তারা বিশেষভাবে সতর্ক করে বলেছে যে, এই সামরিক হুমকি এখন আর কেবল তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং সাধারণ মালবাহী কন্টেইনার জাহাজ এবং বৃহদাকার পণ্যবাহী বাল্ক ক্যারিয়ারগুলোও এখন এই সংঘাতের মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছে, যা বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে এক অশনিসংকেত।
গত দশ দিনে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই জলপথের আশেপাশে হামলার ঘটনা জ্যামিতিক হারে বেড়ে গেছে। এই বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে যে, তাদের বিভিন্ন বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর নৌ অবরোধ এবং গত মাসে তেহরানের ওপর নতুন করে আরোপ করা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই তারা এই প্রণালিতে নিজেদের হামলার মাত্রা এবং তীব্রতা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালী এবং এর আশপাশের বিশাল সামুদ্রিক এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর এই বহুমুখী হুমকি এখন এক চরম আকার ধারণ করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই সাম্প্রতিক যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক পঞ্চমাংশই এই একটিমাত্র সরু প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হতো।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল জলপথের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা এখন সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছে। গত আটাশে ফেব্রুয়ারি ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পর থেকে তেহরান এই কৌশলগত জলপথের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোরভাবে জোরদার করার জন্য মরিয়া প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক এবং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবেই ইরান আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর এই ধরনের অঘোষিত বিধিনিষেধ এবং সামরিক প্রতিবন্ধকতা আরোপ করছে।
এই প্রসঙ্গে ইরানের দুজন অত্যন্ত ঊর্ধ্বতন এবং প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে তাদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য জানিয়েছেন। তারা নিশ্চিত করেছেন যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বিদেশি জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ইরান এখন ক্রমাগত নতুন নতুন এবং অত্যন্ত জটিল সামরিক কৌশল অবলম্বন করছে।
তাদের মতে, ইরানের এই আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম চড়া রাখা, যার মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করা যায়।
একইসাথে, আসন্ন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের ওপর পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করাও তাদের এই সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশলের একটি অন্যতম অংশ বলে ওই কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন।
সংঘাতের প্রাথমিক পর্যায়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র মূলত অপরিশোধিত তেলবাহী বৃহদাকার ট্যাঙ্কারগুলোকে লক্ষ্য করে একে অপরের ওপর হামলা চালালেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ পণ্যবাহী এবং মালবাহী কন্টেইনার জাহাজগুলোও এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের নির্মম শিকারে পরিণত হয়েছে।
যার ফলশ্রুতিতে ইতোমধ্যেই অসংখ্য মূল্যবান বাণিজ্যিক জাহাজ সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়েছে অথবা সাগরের গভীরে চিরতরে হারিয়ে গেছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, ভূমধ্যসাগরীয় দেশ মাল্টার পতাকাবাহী একটি বৃহদাকার কন্টেইনার জাহাজ, যার নাম ছিল ‘সাফিন প্রেস্টিজ’, সেটি গত মার্চ মাসে একটি অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল, যা মূলত একটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র বা অনুরূপ কোনো ধ্বংসাত্মক বস্তুর সরাসরি আঘাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
ভয়াবহ সেই হামলার পর কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা করলেও পরবর্তীতে জাহাজটি হরমুজ প্রণালীর উত্তর দিকের গভীর জলরাশিতে ডুবে যায়। চলমান এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে ইরানের হামলায় হরমুজে ডুবে যাওয়া প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ছিল এই সাফিন প্রেস্টিজ।
পরবর্তীতে এপ্রিল মাসেও উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি, বরং ওই মাসে ইরানের চৌকস রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’ নামের অপর একটি বিশাল কন্টেইনারবাহী জাহাজের ওপর ঝটিকা সামরিক হামলা চালিয়ে সেটিকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের জিম্মায় বা জব্দ করে নেয়।
একের পর এক ঘটে যাওয়া এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, হরমুজ প্রণালির বুক চিরে বয়ে চলা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ এখন ইতিহাসের অন্যতম বিপজ্জনক এবং অনিশ্চিত একটি সময় পার করছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে গোটা বিশ্বের অর্থনীতির ওপর।