সামরিক পরিমণ্ডলে এই বিধ্বংসী অস্ত্রটিকে ব্যাপকভাবে ‘মাদার অব অল বোম্বস’ বা ‘সকল বোমার জননী’ নামে অভিহিত করা হয়। তুরস্কের আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির এক বিশদ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকে বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সামরিক সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, ইরানের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতা প্রতিরোধ এবং দেশটির শক্ত প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যেই পেন্টাগনের শীর্ষ সামরিক কৌশলবিদরা এই ধরনের একটি চরম পদক্ষেপের সম্ভাবনা গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করছেন।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে চিরতরে বদলে দিতে পারে বলে সামরিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। মার্কিন প্রশাসনের এই গোপন সামরিক পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন সামরিক বাহিনীকে বিশেষ নির্দেশনা পাঠিয়েছেন।
সেই নির্দেশনায় ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো এবং তাদের জাতীয় আয়ের প্রধান উৎস জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে অতিরিক্ত সামরিক আঘাত হানার কার্যকর বিকল্পগুলো দ্রুত প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কিংবা অবিলম্বে নির্বাচনের পরে যে কোনো সময়ে এই ধরনের আক্রমণ পরিচালনা করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত অঞ্চলগুলো থেকে সামগ্রিক সেনা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই ইরানের বিরুদ্ধে এই ধরনের কার্যকর আঘাত হানার বিষয়টি ওয়াশিংটনের কৌশলগত ভাবনায় প্রাধান্য পাচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সমীকরণ পরিবর্তনের পূর্বে ইরানকে এক চরম বার্তা দেওয়াই এই পরিকল্পনার অন্যতম গোপন লক্ষ্য। সামরিক কৌশলবিদদের বিশেষ নজর এখন পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নামক একটি পর্বতের নিচে অবস্থিত অত্যন্ত সুরক্ষিত ও গোপনীয় ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনার ওপর।
ওয়াশিংটন এবং তাদের প্রধান মধ্যপ্রাচ্যীয় মিত্র ইসরায়েলের যৌথ গোয়েন্দা তথ্যে জোরালোভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, ইরান তাদের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও আধুনিক পারমাণবিক সরঞ্জামের একটি তাৎপর্যপূর্ণ অংশ এই পাহাড়ি ঘাঁটির গভীরে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সংরক্ষণ করে রেখেছে।
এই সুনির্দিষ্ট ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক কেন্দ্রটিকে চিরতরে নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই দানবীয় এই অ-পারমাণবিক বোমাটি ব্যবহারের পরিকল্পনা বিশেষভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার নিরাপত্তা পরিষদ ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ক্রমাগত চাপ দিয়ে আসছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে।
আঞ্চলিক এই ভূ-রাজনৈতিক চাপ মার্কিন সামরিক নীতিকে ক্রমশ সরাসরি সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যদিও এই বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষক ও প্রকৌশলীদের মধ্যে গভীর সংশয় ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
কারিগরি দিক থেকে জিপিএস নিয়ন্ত্রিত এই সুবিশাল বোমাটি প্রায় নয়টি নগর ব্লকের সমান বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এক নিমেষে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম। বোমার প্রচণ্ড বিস্ফোরণজনিত বাতাসের চাপ চারপাশের সবকিছু গুঁড়িয়ে দিতে পারলেও এটি মূলত মাটির গভীরে প্রবেশ করার উদ্দেশ্যে তৈরি কোনো বাঙ্কার বিধ্বংসী অস্ত্র নয়।
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের মতো দুর্ভেদ্য পাহাড়ি অঞ্চলের শক্ত গ্রানাইট পাথরের স্তর ভেদ করে মাটির শত ফুট গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতা এই বোমার নেই। ফলে ভূগর্ভস্থ মূল পারমাণবিক স্থাপনাগুলো এই বোমার আঘাতে আদৌ পুরোপুরি ধ্বংস হবে কি না, তা নিয়ে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যেই মতদ্বৈততা রয়েছে।
গ্রানাইটের প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর ভেদ করার এই প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা অস্ত্রটির ব্যবহার বাদ দেননি। সামরিক নীতিনির্ধারকদের মতে, গভীর স্থাপনা সম্পূর্ণরূপে ধূলিসাৎ করতে না পারলেও এই বোমার ব্যবহারের পেছনে রয়েছে একটি সুদূরপ্রসারী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকৌশল।
বোমার ভয়াবহ বিস্ফোরণ, প্রলয়ংকারী শব্দ এবং দৃশ্যমান ধ্বংসযজ্ঞ শত্রু শিবিরের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। একই সঙ্গে স্থাপনার প্রবেশপথ, সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মাটির উপরিভাগের যাবতীয় আনুষঙ্গিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে পুরো এলাকাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার ক্ষমতা এই অস্ত্রের রয়েছে।
এই ধরনের একটি অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে শত্রুপক্ষকে এই বার্তা দেওয়াই লক্ষ্য যে, তাদের কোনো গোপন সুরক্ষিত অঞ্চলই মার্কিন সামরিক সক্ষমতার আওতার বাইরে নয়। মনস্তাত্ত্বিক ভীতি সঞ্চার এবং ভবিষ্যৎ যেকোনো পারমাণবিক কার্যক্রমের গতিপথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে দেওয়ার সামরিক লক্ষ্য থেকেই পেন্টাগন এমন বিপজ্জনক অস্ত্রের ব্যবহারকে নিজেদের আক্রমণাত্মক তালিকার শীর্ষে রেখেছে।
তবে এই ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা ঘিরে খোদ মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ নীতি ও কূটনৈতিক মহলেও গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। কর্মকর্তাদের একাংশ প্রকাশ্যে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, কোনো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল কিংবা সাধারণ বেসামরিক লোকালয়ের কাছাকাছি এই দানবীয় বোমার তীব্র বিস্ফোরণ ঘটানো হলে তা এক অভাবনীয় মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এর ফলে বিপুল সংখ্যক নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটবে, যা আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বৈশ্বিক জনমতকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
একই সঙ্গে এটি জাতিসংঘসহ বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র সমালোচনার জন্ম দেবে, যা ওয়াশিংটনকে বিশ্বমঞ্চে একঘরে করে ফেলতে পারে। এই চরম মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বাস্তবতাকে সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করেও ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা ইরানের বিরুদ্ধে চরম আগ্রাসী মনোভাব বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
সামরিক শক্তির এই ধরনের প্রদর্শন বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল এবং দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলছেন, এই ধরনের বেপরোয়া সামরিক পদক্ষেপ কার্যকর হলে তা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল জুড়ে এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধানল ছড়িয়ে দেবে, যার প্রভাব বিশ্ব বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর মারাত্মক আঘাত হানবে।