বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৫, ২০২৬
৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রিয়াদের বিমানবন্দরে হুথিদের বেপরোয়া হামলা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম

রিয়াদের বিমানবন্দরে হুথিদের বেপরোয়া হামলা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে এক নতুন এবং ভয়াবহ মাত্রা যোগ করেছে ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মধ্যকার চলমান সামরিক উত্তেজনা। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে গত মাত্র পনেরো দিনের ব্যবধানে অন্তত কুড়িবার ভয়াবহ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে ইয়েমেনের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি।

 

বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচলের অন্যতম প্রধান এই কেন্দ্রবিন্দুতে এমন ধারাবাহিক হামলার ঘটনা সমগ্র অঞ্চলের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় এক গভীর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।

 

একটি সার্বভৌম দেশের রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে এত স্বল্প সময়ে এত বিপুল সংখ্যক হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই সংঘাত এখন আর কেবল সীমান্ত এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মূল ভিত্তিকে আঘাত করছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের এই সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি বেশ কিছুদিন ধরেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর এবং অর্থনৈতিক প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত তেল উৎপাদনকারী অবকাঠামোগুলো লক্ষ্য করে তাদের হামলার মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি করেছে।

 

এই ধারাবাহিক হামলার বিস্তারিত বিবরণ, সামরিক ক্ষয়ক্ষতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরতে রিয়াদে এক জরুরি ও বিশদ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সৌদি জোট।

 

ওই সংবাদ সম্মেলনে সামরিক জোটের অন্যতম শীর্ষ মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুথিদের এসব উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, আন্তর্জাতিক আইন, জেনেভা কনভেনশন এবং মানবাধিকারের সার্বজনীন নীতিমালা চরমভাবে লঙ্ঘন করে বেসামরিক নাগরিকদের জীবন বিপন্ন করার পাশাপাশি বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, তেল শোধনাগার ও অন্যান্য সাধারণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে যে সমস্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে, তা হুথিদের অবিলম্বে এবং নিঃশর্তভাবে বন্ধ করতে হবে।

 

তার মতে, এ ধরনের আক্রমণ শুধু সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যই হুমকি নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপরও এক চরম আঘাত। সামরিক উত্তেজনার এই ভয়াবহ ডামাডোলের পাশাপাশি এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট সমাধানে পর্দার অন্তরালে চলা কূটনৈতিক তৎপরতার বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে।

 

তবে সেই কূটনৈতিক উদ্যোগ আপাতত চরম ব্যর্থতার মুখেই পড়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। সৌদির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে নিশ্চিত করেছেন যে, দুই পক্ষের মাঝে যখন সংঘাত ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর আকার ধারণ করছিল, ঠিক সেই সংকটময় ও স্পর্শকাতর প্রেক্ষাপটে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইয়েমেনের হুথি নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের নিরন্তর চেষ্টা চালিয়েছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ।

 

রিয়াদের মূল লক্ষ্য ছিল আলোচনার টেবিলে বসে একটি গ্রহণযোগ্য যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানো। কিন্তু তাদের সেই ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আলোর মুখ দেখেনি, কারণ বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি প্রতিবেশি রাষ্ট্র ওমানে কোনো ধরনের শান্তি বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে সরাসরি ও অত্যন্ত অনমনীয়ভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

 

সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাবলিক ডিপ্লোমেসি বা জননীতি বিষয়ক সম্মানীত উপমন্ত্রী ডক্টর রায়েদ ক্রিমলি দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে আয়োজিত এক বিশেষ ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে এই ব্যর্থ কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে, এই সশস্ত্র সংঘাত যখন নতুন করে চরম আকার ধারণ করতে শুরু করে, তখন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের প্রাণহানি কমানোর স্বার্থে আমরা ওমানের রাজধানী মাসকাটে একটি গঠনমূলক ও অর্থবহ শান্তি বৈঠক করার জন্য হুথিদের প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানিয়েছিলাম।

 

মাসকাট দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বিবদমান পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর একটি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি শান্তি আলোচনার সেই গঠনমূলক আহ্বান সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

 

ডক্টর ক্রিমলি বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে জানান যে, কয়েক সপ্তাহ আগে মাসকাটে ওই প্রস্তাবিত বৈঠকের জন্য করা সেই যোগাযোগই ছিল হুথিদের প্রতি সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক বার্তা।

 

এরপর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে আর কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপিত হয়নি, যা ইয়েমেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ শান্তি প্রক্রিয়াকে এক গভীর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

 

এই চরম সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই ইসলাম ধর্মের দ্বিতীয় পবিত্রতম শহর মদিনার আকাশসীমায় একটি সন্দেহভাজন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ভূপাতিত করার অভাবনীয় দাবি করেছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট।

 

মদিনার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর, ঐতিহাসিক ও পবিত্র ধর্মীয় স্থানে এ ধরনের সামরিক হামলার অপচেষ্টা সমগ্র বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে এবং এটি বৈশ্বিক মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (যা পূর্বে বিশ্বব্যাপী টুইটার নামে সুপরিচিত ছিল) দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তায় অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, “মদিনার পবিত্র আকাশসীমায় অনুপ্রবেশ করা একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত সফলতার সাথে ধ্বংস করা হয়েছে।”

 

তার এই ঘোষণার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে বৈশ্বিক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের চরমভাবে বিস্মিত করে পবিত্র শহর মদিনায় হামলার এই গুরুতর অভিযোগ এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার সৌদি জোটের এই দাবি সম্পূর্ণভাবে এবং অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছে হুথি বিদ্রোহীরা।

 

ইয়েমেনের সশস্ত্র এই গোষ্ঠীটির সামরিক শাখার প্রধান মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে এক পাল্টা আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দাবি করেছেন যে, বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের অভ্যন্তরে বা এর কোনো সামরিক কিংবা বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হুথিদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালানো হয়নি।

 

হুথিদের এই সরাসরি ও দ্ব্যর্থহীন অস্বীকৃতি চলমান এই সংঘাতের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রচারণাযুদ্ধে এক সম্পূর্ণ নতুন মাত্রার জন্ম দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই একে অপরের দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে প্রকৃত সত্য অনুধাবন করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

ইয়েমেনে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ মূলত সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে অত্যন্ত জটিল ও সংঘাতময় করে তুলেছে। একদিকে আন্তর্জাতিক মদদপুষ্ট হুথি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ দেশের একটি বিশাল ও কৌশলগত অংশের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত শক্ত হাতে ধরে রেখেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় বসাতে এবং নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে ২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যাপক মাত্রায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট।

 

এই দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে ইয়েমেনে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ চরম অনাহার, অপুষ্টি, মারাত্মক রোগব্যাধি এবং নিরাপদ বাসস্থানের অভাবে প্রতিনিয়ত ধুঁকছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘ বারবার স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জোরালো আহ্বান জানালেও, রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমন উপর্যুপরি বেপরোয়া হামলা এবং মদিনার মতো পবিত্র শহরের দিকে অত্যাধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও অনেক বেশি ঘোলাটে ও বিপজ্জনক করে তুলেছে।

 

কূটনৈতিক সমাধানের সবকটি পথ ক্রমশ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং ওমানের মাসকাটে প্রস্তাবিত শান্তি আলোচনা অঙ্কুরেই ভেস্তে যাওয়ার কারণে সহসাই এই যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তির সুবাতাস বইবে, এমন আশা এখন অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে আসছে।

 

সংঘাতের এই নতুন ও আক্রমণাত্মক পর্যায় কেবল সৌদি আরব বা ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জন্যই নয়, বরং সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তার জন্য এক অতিকায় ভয়াবহ হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো এবং বৈশ্বিক সংস্থাগুলো যদি দ্রুত কোনো কার্যকর, নিরপেক্ষ ও সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়, তবে আগামী দিনগুলোতে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত, রক্তক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক রূপ নিতে পারে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা গভীর শঙ্কা ও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

 

- এএফপি