বৃহস্পতিবার, পনেরোই অক্টোবর, শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত প্রশাসনিক ভবনে বিকট শব্দে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে, যা পুরো শহরটিতে তীব্র আতঙ্ক ও ভীতির সঞ্চার করে।
ইয়েমেনের রাজধানী সানা দীর্ঘকাল ধরে হুথি বিদ্রোহীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকায়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কর্তৃক স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার মূলত এই এডেন শহরটিকেই নিজেদের অস্থায়ী রাজধানী এবং প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
দেশের শীর্ষ প্রশাসনিক ভবনে এ ধরনের সরাসরি ও সুপরিকল্পিত হামলা মূলত ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধকে এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড়ের দিকে ধাবিত করছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা।
স্থানীয় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সরাসরি সম্প্রচারিত খবর অনুযায়ী, অত্যন্ত সুরক্ষিত এই প্রেসিডেন্ট প্রাসাদটি স্থানীয়ভাবে ‘আল-মাশিক’ নামে সুপরিচিত। বৃহস্পতিবারের এই ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাসাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা অন্তত দুইজন নিরপরাধ নিরাপত্তারক্ষী ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়েছেন এবং আরও কমপক্ষে ছয়জন রক্ষী গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।
তবে সরকার ও সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির বিষয় হলো, হামলার সময় প্রাসাদের ভেতরে অবস্থান করা সরকারের মন্ত্রিসভার সকল মন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদে রয়েছেন।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক মন্ত্রী নায়েফ সালেহ আল-বাকরি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম আল-আরাবিয়াকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই হতাহতের খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, হুথি বিদ্রোহীরা যতই ভয়াবহ হামলা চালাক না কেন, বর্তমান সরকার কোনো অবস্থাতেই এডেন শহর ছেড়ে পিছু হটবে না। সরকারের এই অনড় অবস্থান প্রমাণ করে যে, তারা হুথিদের এই সামরিক আগ্রাসনের কাছে নতিস্বীকার করতে একেবারেই প্রস্তুত নয়।
কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার নিজস্ব প্রতিবেদক ঘটনাস্থল থেকে সরাসরি জানিয়েছেন যে, প্রাসাদের আশপাশের এলাকা থেকে তারাও বিকট বিস্ফোরণের শব্দ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে শুনতে পেয়েছেন।
পরবর্তীতে সরকারি ও নিরাপত্তা সূত্র থেকে তারা নিশ্চিত হন যে, দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ভবন প্রেসিডেন্ট প্রাসাদকে লক্ষ্য করেই এই সুনির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র হামলাটি চালানো হয়েছে। এছাড়া, বৈশ্বিক বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে সরকারের একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে যে, হুথিরা তাদের এই প্রাণঘাতী হামলায় কেবল একটি নয়, বরং একাধিক অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা তাদের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা ও বেপরোয়া মনোভাবেরই এক উদ্বেগজনক প্রতিফলন।
হুথি বিদ্রোহীদের এই আগ্রাসী সামরিক তৎপরতা কেবল ইয়েমেনের ভৌগোলিক সীমানার মাঝেই আবদ্ধ নেই; বরং তারা পার্শ্ববর্তী পরাশক্তি সৌদি আরবের অভ্যন্তরেও ধারাবাহিকভাবে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের পক্ষ থেকে এক অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
জোটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি কেবল চলতি মাসের গত পনেরো দিনের ব্যবধানে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে অন্তত কুড়িবার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজধানীর অত্যন্ত ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এত অল্প সময়ের মধ্যে এত বিপুল সংখ্যক হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, হুথিরা আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে সরাসরি বেসামরিক নাগরিকদের জীবন বিপন্ন করার এক ধ্বংসাত্মক কৌশল গ্রহণ করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর এবং দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত তেল উৎপাদনকারী অবকাঠামোগুলো লক্ষ্য করে তাদের সামরিক হামলার মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি করেছে।
এই ধারাবাহিক হামলার বিস্তারিত বিবরণ ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা তুলে ধরতে রিয়াদে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সৌদি সামরিক জোট। ওই সংবাদ সম্মেলনে সামরিক জোটের অন্যতম শীর্ষ মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হুথিদের এসব কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান।
তিনি সুস্পষ্টভাবে দাবি করেন যে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, তেল শোধনাগার ও অন্যান্য সাধারণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে যে সমস্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে, তা হুথিদের অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে বন্ধ করতে হবে।
বেসামরিক নাগরিক ও স্থাপনার ওপর এমন সুপরিকল্পিত হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন এবং তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
সামরিক উত্তেজনার এই ভয়াবহ ডামাডোলের পাশাপাশি এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট সমাধানে পর্দার অন্তরালে চলা কূটনৈতিক তৎপরতাও চরম ব্যর্থতার মুখে পড়েছে। সৌদির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে নিশ্চিত করেছেন যে, দুই পক্ষের মাঝে যখন সংঘাত ক্রমশ তীব্র আকার ধারণ করছিল, ঠিক সেই প্রেক্ষাপটে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইয়েমেনের হুথি নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের নিরন্তর চেষ্টা চালিয়েছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ।
রিয়াদের মূল লক্ষ্য ছিল আলোচনার মাধ্যমে একটি টেকসই যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানো। কিন্তু বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি ওমানে কোনো ধরনের শান্তি বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে সরাসরি ও অত্যন্ত অনমনীয়ভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এই প্রত্যাখ্যান প্রমাণ করে যে, হুথিরা আপাতত শান্তি আলোচনার চেয়ে সামরিক সমাধানের দিকেই বেশি মনোযোগী, যা ইয়েমেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ইয়েমেনে দীর্ঘ প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই গৃহযুদ্ধ মূলত সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে অত্যন্ত জটিল ও সংঘাতময় করে তুলেছে। একদিকে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানাসহ দেশের একটি বিশাল অংশের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত শক্ত হাতে ধরে রেখেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় বসাতে এবং নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট নিরবচ্ছিন্নভাবে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
এই দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে ইয়েমেনে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ চরম অনাহার, অপুষ্টি, মারাত্মক রোগব্যাধি এবং নিরাপদ বাসস্থানের অভাবে প্রতিনিয়ত ধুঁকছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘ বারবার স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জোরালো আহ্বান জানালেও, প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে এমন বেপরোয়া হামলা এবং রিয়াদের বিমানবন্দরে উপর্যুপরি আক্রমণের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও অনেক বেশি ঘোলাটে করে তুলেছে।
কূটনৈতিক সমাধানের সবকটি পথ ক্রমশ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার কারণে সহসাই এই যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তির সুবাতাস বইবে, এমন আশা এখন অত্যন্ত ক্ষীণ।
সংঘাতের এই নতুন ও আক্রমণাত্মক পর্যায় কেবল ইয়েমেন বা সৌদি আরবের সাধারণ মানুষের জন্যই নয়, বরং সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য এক অতিকায় ভয়াবহ হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো যদি দ্রুত কোনো কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে আগামী দিনগুলোতে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত, রক্তক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক রূপ নিতে পারে বলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা গভীর শঙ্কা প্রকাশ করছেন। ইয়েমেনের অস্থায়ী রাজধানী এডেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে এই সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সেই আসন্ন ভয়াবহতারই এক সুস্পষ্ট ও অশনিসংকেত।