বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৫, ২০২৬
৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইরানের, জাহাজ চলাচলে লাগবে আগাম অনুমতি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:২৩ পিএম

হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইরানের, জাহাজ চলাচলে লাগবে আগাম অনুমতি
ছবি : Collected

বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনী এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল জলপথ হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ, একচ্ছত্র ও নিশ্ছিদ্র আধিপত্যের কথা পুনরায় অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।

 

দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কৌশলগতভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথটি বর্তমানে কার্যত তাদের সম্পূর্ণ ও নিবিড় নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

 

এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর জলপথ ব্যবহার করে যেকোনো দেশের বাণিজ্যিক পণ্যবাহী বা সামরিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে এখন থেকে অবশ্যই তেহরানের পূর্বানুমতি ও আনুষ্ঠানিক সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে।

 

ইরানের সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ এবং সমন্বয় বিষয়ক উপপ্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল হাবিবুল্লাহ সাইয়্যারি বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এই অত্যন্ত কঠোর ও সুদূরপ্রসারী সামরিক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

 

তাঁর এই বক্তব্য এমন এক চরম উত্তেজনাকর সময়ে সামনে এল, যখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক নজিরবিহীন ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের আবহ বিরাজ করছে এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজার চরম অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

 

রিয়ার অ্যাডমিরাল হাবিবুল্লাহ সাইয়্যারি হরমুজ প্রণালি এবং তৎসংলগ্ন বিশাল সামুদ্রিক অঞ্চলে ইরানের বহুমুখী সামরিক উপস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে পশ্চিমাদের উদ্দেশ্যে একটি সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী বার্তা দিয়েছেন।

 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ওই অঞ্চলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমানে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে দিবারাত্রি অত্যন্ত নিবিড় নজরদারি বজায় রেখেছে। অঞ্চলটিতে সামরিক বাহিনীর সুনির্দিষ্ট কৌশলগত অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, হরমুজ প্রণালির পশ্চিম অংশে ইরানের অত্যন্ত চৌকস ও অভিজাত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইআরজিসি নামে সমধিক পরিচিত, তাদের নৌবাহিনী অত্যন্ত সুদৃঢ়, দুর্ভেদ্য ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়ে পাহারায় নিযুক্ত রয়েছে।

 

অন্যদিকে, প্রণালির পূর্ব অংশ থেকে শুরু করে ওমান সাগরের উত্তরাঞ্চলীয় গভীর জলসীমা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সামুদ্রিক এলাকায় ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনী নিজেদের শক্ত, সুসংগঠিত ও নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি বজায় রেখেছে।

 

শক্তিশালী এই দুই বাহিনীর সমন্বিত, সুপরিকল্পিত ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ের কারণে প্রণালির ভেতর দিয়ে যেকোনো ধরনের অননুমোদিত বা সন্দেহভাজন চলাচল বর্তমানে সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন।

 

হরমুজ প্রণালির বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা নিখুঁতভাবে বর্ণনা করতে গিয়ে এই শীর্ষ ইরানি সামরিক কর্মকর্তা প্রণালিটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য কার্যত 'বন্ধ' রয়েছে বলে এক চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন।

 

তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এই জলপথের বর্তমান অচলাবস্থা এবং পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বেগের মাত্রাই প্রমাণ করে যে ইরান এর ওপর ঠিক কতটা গভীর প্রভাব বিস্তার করে আছে।

 

রিয়ার অ্যাডমিরাল সাইয়্যারি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সমীকরণের দিকে সরাসরি ইঙ্গিত করে বলেন, হরমুজ প্রণালি যদি আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দিয়ে সম্পূর্ণ খোলা এবং সবার জন্য বাধাহীন থাকত, তবে এই জলপথ দিয়ে আগের মতোই নির্বিঘ্নে ও অবাধে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবাহিত হতো।

 

আর সেটি হলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোতে পেট্রল ও অন্যান্য দৈনন্দিন জ্বালানির দাম এতটা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেত না। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে যে মারাত্নক বিঘ্ন ঘটার দৃশ্য বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, সেই বিষয়টিকে তিনি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সফল সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় ও বাস্তব প্রমাণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

 

তাঁর মতে, বিষয়টি এখন কোনো গোপন সামরিক কৌশল নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের কাছে দিবালোকের মতো সম্পূর্ণ স্পষ্ট একটি বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের ক্ষেত্রে তেহরানের এই নতুন, কঠোর ও আপসহীন নীতি কোনো রাষ্ট্র বা নৌযান লঙ্ঘন করলে তার পরিণতি ঠিক কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সে বিষয়েও রিয়ার অ্যাডমিরাল সাইয়্যারি কোনো ধরনের রাখঢাক না করেই সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

 

তিনি অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জোর দিয়ে বলেন, যদি কোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজ, বৃহদাকার তেলের ট্যাঙ্কার অথবা কোনো দেশের অত্যাধুনিক সামরিক নৌযান এই অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রণালি দিয়ে নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছাতে চায়, তবে তা অবশ্যই ইরানের সংশ্লিষ্ট সামরিক ও নৌ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আগে থেকে রেডিও বা অন্যান্য মাধ্যমে আগাম সমন্বয় করে এবং সুস্পষ্ট ও লিখিত অনুমতি সাপেক্ষে করতে হবে।

 

আর যদি কোনো পক্ষ ইরানের এই সার্বভৌম নির্দেশ অমান্য করে স্বাধীনভাবে বা শক্তি প্রয়োগ করে চলাচলের বিন্দুমাত্র অপচেষ্টা করে, তবে তাদের পরিণতি ঠিক কতটা করুণ হতে পারে, তা সমগ্র বিশ্ব আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পর্দাতেই সরাসরি দেখতে পাবে বলে তিনি অত্যন্ত কঠিন ভাষায় সতর্ক করে দেন।

 

তাঁর এই প্রচ্ছন্ন হুমকির মাধ্যমে মূলত সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগরে ইরানের নৌবাহিনীর হাতে আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে বেশ কয়েকটি বিদেশি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক জাহাজ আটক বা জব্দ হওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলোর দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা গভীরভাবে মনে করছেন।

 

হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করলে ইরানের শীর্ষ এই সামরিক কর্মকর্তার ঘোষণা আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও অর্থনীতিতে এক বিরাট কম্পনের সৃষ্টি করেছে।

 

আন্তর্জাতিক মানচিত্র অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে সংযুক্তকারী এই অত্যন্ত সরু ও কৌশলগত জলপথটি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বা এলএনজির একটি বিশাল ও অপরিহার্য অংশ পরিবাহিত হয়ে থাকে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ শীর্ষ দেশগুলো থেকে উত্তোলিত মহামূল্যবান জ্বালানি এই একটি মাত্র পথ দিয়েই এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিশাল ও ক্ষুধার্ত বাজারগুলোতে পৌঁছায়। ফলে এই প্রণালির ওপর যেকোনো ধরনের সামরিক নিয়ন্ত্রণ, অবরোধ বা সামান্যতম বাধা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক মুহূর্তে সরাসরি পঙ্গু করে দেওয়ার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা রাখে।

 

ইরান দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমাদের আরোপিত নানামুখী ও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ এবং ক্রমাগত সামরিক হুমকির সরাসরি জবাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার এই কৌশলগত অস্ত্রটিকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক, কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে আসছে।

 

রিয়ার অ্যাডমিরাল সাইয়্যারির এই সর্বশেষ ও কড়া ঘোষণা মূলত সেই দীর্ঘমেয়াদি ও পরীক্ষিত কৌশলগত প্রতিরোধেরই এক নতুন, আত্মবিশ্বাসী এবং আক্রমণাত্মক পর্যায়ের বহিঃপ্রকাশ। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সূক্ষ্ম মতে, ইরানের সেনাবাহিনীর এই শীর্ষ পর্যায়ের নেতার বক্তব্য কেবল একটি রুটিন সামরিক সতর্কবার্তা নয়; এটি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি তেহরানের একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

 

যখন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য এক বৃহত্তর, অস্থিতিশীল এবং বহুমুখী আঞ্চলিক যুদ্ধের ঠিক দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, ঠিক সেই চরম সংকটময় মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র ও নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করে ইরান মূলত আন্তর্জাতিক দরকষাকষির টেবিলে নিজেদের ক্ষমতাকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে নিয়েছে।

 

এই ঘোষণার মাধ্যমে তেহরান পুরো বিশ্বকে অত্যন্ত সুকৌশলে বুঝিয়ে দিল যে, তাদের ওপর ভবিষ্যতে আরোপিত যেকোনো নতুন অর্থনৈতিক বা সামরিক চাপের সরাসরি ও ভয়ংকর প্রভাব পড়বে পশ্চিমা বিশ্বের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর, বিশেষ করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সৃষ্ট চরম মূল্যস্ফীতির কারণে।

 

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই নিরঙ্কুশ সামরিক নজরদারি এবং জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে পূর্বানুমতি গ্রহণের এই নতুন ও কঠোর বাধ্যবাধকতা আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চরম পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও কতটা গভীর ও জটিল করে তোলে, সেটাই এখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

- পার্সটুডে