দেশটির শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের তথ্য অনুযায়ী, আকাশপথের সরাসরি সামরিক আক্রমণের পাশাপাশি রাষ্ট্রের ভেতরে সক্রিয় থাকা ইরানের গোপন গুপ্তচর চক্র বা তথাকথিত স্লিপার সেলের গুরুতর হুমকিও অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইনসভার উচ্চকক্ষ হিসেবে পরিচিত ফেডারেল ন্যাশনাল কাউন্সিলের প্রতিরক্ষা, অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির প্রভাবশালী চেয়ারম্যান ডক্টর আলী রশিদ আল নুয়াইমি সম্প্রতি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য আন্তর্জাতিক মহলে প্রকাশ করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম গালফ নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে শুক্রবার এই তথ্যটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। দুবাই শহরে আয়োজিত ‘ইউএই করেসপন্ডেন্টস কাউন্সিল’-এর এক বিশেষ আলোচনা সভায় আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনে ভাষণ দেওয়ার সময় ডক্টর আল নুয়াইমি এই স্পর্শকাতর নিরাপত্তা পরিস্থিতির গভীর পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, ওই সংঘাতপূর্ণ দিনগুলোতে ইরানের পক্ষ থেকে আসা হুমকি কেবল প্রকাশ্য আকাশসীমা বা ক্ষেপণাস্ত্রের নিক্ষেপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং ইরানি সামরিক বাহিনীকে সুনির্দিষ্ট নিশানা নির্ধারণ ও হামলার দিকনির্দেশনায় সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে তাদের কিছু গোপন চর বা আত্মগোপনে থাকা স্লিপার সেল গোপনে নানা তৎপরতা চালাচ্ছিল।
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অখণ্ডতা এবং সার্বভৌম সুরক্ষার ক্ষেত্রে এই ধরনের অভ্যন্তরীণ গুপ্তচরবৃত্তি এক নজিরবিহীন শঙ্কা তৈরি করেছিল। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চমাত্রার পেশাদারিত্বের কারণে সেই সমস্ত ষড়যন্ত্রকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা সম্ভব হয়েছিল।
ডক্টর আল নুয়াইমি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, এমন এক চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি ও তীব্র সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও দেশের সাধারণ নাগরিক ও সেখানে বসবাসরত লাখো বিদেশি প্রবাসীর জীবনযাত্রায় কোনো ধরনের স্থবিরতা নামতে দেওয়া হয়নি।
সরকারি ব্যবস্থাপনা ও নিখুঁত নিরাপত্তা কাঠামোর কল্যাণে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নাগরিক পরিবেশ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এমনকি সংঘাতপূর্ণ সেই মুহূর্তগুলোতেও দেশটির সুবিশাল বিপণিবিতান, অভিজাত রেস্তোরাঁ ও সাধারণ মানুষের অবকাশযাপনের সমুদ্রসৈকতগুলো পুরোপুরি উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল।
নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের মনে অযথা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে প্রশাসন এক অনন্য ভারসাম্য বজায় রেখে কাজ করেছে। এটি আন্তর্জাতিক মহলে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে, আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সুদৃঢ় অভ্যন্তরীণ সুরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে বড় ধরনের যুদ্ধপরিস্থিতিতেও নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ধরে রাখা সম্ভব।
এই প্রসঙ্গে নিজের একটি ব্যক্তিগত ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন আমিরাতি এই শীর্ষ নীতিনির্ধারক। তিনি জানান, সেই উত্তেজনাকর হামলা চলাকালেই তিনি রাজধানী আবুধাবির ব্যস্ততম ও অভিজাত ‘গ্যালেরিয়া মলে’ উপস্থিত ছিলেন।
সেখানে আকস্মিকভাবে এক ইসরায়েলি পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ঘটে এবং ওই সংঘাতপূর্ণ আবহে তাকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে সাধারণ মানুষের ভিড়ে ঘুরে বেড়াতে দেখে তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হন।
আল নুয়াইমির মতে, এই ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের সামাজিক বাস্তবতা, নাগরিক সহনশীলতা ও বহুত্ববাদী সহাবস্থানের এক অনন্য ও ইতিবাচক বাস্তবতাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরে। চারপাশের যুদ্ধংদেহী পরিবেশের মধ্যেও শান্তিকামী সমাজের প্রতিদিনের জীবন থেমে থাকে না, বরং তা যেকোনো ধ্বংসাত্মক মানসিকতার চেয়েও অধিক শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
সংঘাতময় পরিস্থিতিতেও কূটনৈতিক আলোচনার পথকে উন্মুক্ত রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি বোঝাপড়া জোরদার করার লক্ষ্যে নিজের অব্যাহত প্রচেষ্টার কথাও তুলে ধরেন ডক্টর আল নুয়াইমি। তিনি উল্লেখ করেন, সামরিক সংঘাত কখনোই কোনো সংকটের স্থায়ী সমাধান বয়ে আনতে পারে না।
এই কঠিন বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে তিনি সম্প্রতি সম্পূর্ণ পৃথকভাবে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে পারস্পরিক সহমর্মিতা বাড়ানো এবং গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ উন্মোচন করা।
মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির জন্য রাজনৈতিক যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই বলেই তিনি দৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করেন। এই ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ আরব বিশ্বের শান্তি প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের স্লিপার সেল এবং গুপ্তচরবৃত্তির বিস্তার কোনো বিচ্ছিন্ন বা নতুন ঘটনা নয়। আঞ্চলিক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারের মতো উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের একাধিক সদস্য রাষ্ট্র অতীতে বিভিন্ন সময়ে তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত গোপন নেটওয়ার্ক এবং নাশকতামূলক সেল কার্যকরভাবে শনাক্ত ও ধ্বংস করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সুরক্ষাব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করার লক্ষ্যে এই ধরনের কর্মকাণ্ড উপসাগরীয় অঞ্চলের পারস্পরিক আস্থাকে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে বর্তমান উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি এবং আধুনিক সামরিক গোয়েন্দা নজরদারির কারণে এখন আর কোনো নাশকতামূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কোনো শক্তির পক্ষেই সহজ নয়।
সমগ্র অঞ্চলজুড়ে যৌথ নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার কারণে এসব অপতৎপরতা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সার্বিক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেশটির সর্বোচ্চ সরকারি সংস্থা ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ক্রাইসিস অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’ বা এনসিইএমএ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে।
সংস্থাটি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, যেকোনো আকস্মিক সামরিক বা গোপন হামলার হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে তাদের অত্যাধুনিক প্রাথমিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা দিনরাত সার্বক্ষণিক সক্রিয় রয়েছে।
সম্ভাব্য যেকোনো বড় বিপদের পূর্বাভাস খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনীকে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর ফলে যেকোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর বিরোধের মাঝেও নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী রাখা এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে নাগরিকদের শান্তিময় জীবন নিশ্চিত করাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের বর্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে।