শনিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২৬
২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদি ও ইয়েমেন সংঘাত নিরসনে প্রস্তুত ইরান: ইসমাইল বাঘেই

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:৫০ পিএম

সৌদি ও ইয়েমেন সংঘাত নিরসনে প্রস্তুত ইরান: ইসমাইল বাঘেই
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে চলমান উত্তেজনা এবং অস্থিরতার অবসান ঘটাতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে তেহরান পুরোপুরি প্রস্তুত বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

 

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই সম্প্রতি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। শুক্রবার সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, সামরিক আগ্রাসন বা সংঘাত কখনোই কোনো সংকটের চূড়ান্ত সমাধান হতে পারে না, বরং কূটনৈতিক তৎপরতা এবং পারস্পরিক সম্মানবোধের মাধ্যমেই কেবল টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

 

ইসমাইল বাঘেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সংঘাতরত উভয় পক্ষ যদি আন্তরিকভাবে চায় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করে, তবে ইরান এই দুই দেশের মধ্যকার শত্রুতা বন্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে তেহরান তার সর্বোচ্চ সদিচ্ছা প্রদর্শন করতে বদ্ধপরিকর।

 

একটি নিরপেক্ষ এবং গঠনমূলক অবস্থান থেকে ইরান তার সমস্ত কূটনৈতিক সক্ষমতা প্রয়োগ করে ইয়েমেন এবং সৌদি আরবের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে ইচ্ছুক। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক প্রভাব শুধু এই দুটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে।

 

গত বারো বছরের সংঘাত এবং সামরিক উত্তেজনার ইতিহাস পর্যালোচনা করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই শীর্ষ কর্মকর্তা স্মরণ করিয়ে দেন যে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ বা কঠোর অবরোধ আরোপের মাধ্যমে ইয়েমেন সংকটের কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান অর্জন করা আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না।

 

বছরের পর বছর ধরে চলা বোমাবর্ষণ, সামরিক অভিযান এবং সর্বাত্মক অবরোধ ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জীবনে কেবল অবর্ণনীয় দুর্দশাই ডেকে এনেছে। একটি স্বাধীন দেশের ওপর জোরপূর্বক সামরিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা যে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, ইয়েমেনের বর্তমান পরিস্থিতি তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

 

তাই অস্ত্রের ঝনঝনানি থামিয়ে আলোচনার টেবিলে বসে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যা সমাধানের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি দৃঢ় মত প্রকাশ করেন। ইয়েমেন সংকটের একটি টেকসই এবং স্থায়ী সমাধানের বাস্তবসম্মত রূপরেখা তুলে ধরে ইসমাইল বাঘেই বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত এবং নীতির ওপর জোর দিয়েছেন।

 

তিনি উল্লেখ করেন, সবার আগে ইয়েমেনের জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শর্তহীন সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইয়েমেনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি দেওয়া অপরিহার্য।

 

একইসঙ্গে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়ে বাইরের যেকোনো দেশের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তিনি ইয়েমেনের ওপর আরোপিত আকাশপথ এবং নৌপথের অন্যায় ও অমানবিক অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের জোরালো দাবি জানান।

 

এই দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের কারণে দেশটিতে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকটে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সুতরাং, অবরোধ তুলে নেওয়ার মাধ্যমেই কেবল পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে প্রায়শই অভিযোগ করা হয় যে, ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পেছন থেকে ইন্ধন জোগাচ্ছে ইরান এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ইয়েমেনিদের হামলার পেছনে সরাসরি তেহরানের মদদ রয়েছে।

 

সম্প্রতি সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও এই ধরনের অভিযোগ পুনরায় উত্থাপন করেছিলেন। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এই সমস্ত অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং মনগড়া বলে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে দাবি করেন যে, ইয়েমেনের সামরিক বাহিনী এবং প্রতিরোধ যোদ্ধারা নিজেদের দেশের জাতীয় স্বার্থ, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং কৌশলগত লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।

 

এখানে ইরানের নির্দেশনায় বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে তারা পরিচালিত হয়, এমন দাবি সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই মধ্যস্থতার প্রস্তাব মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা।

 

বেশ কিছু সময় আগে চীনের সফল মধ্যস্থতায় ইরান এবং সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় স্থাপিত হওয়ার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে আস্থার পরিবেশ ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। রিয়াদ এবং তেহরানের মধ্যে এই উন্নত সম্পর্কের প্রভাব ইয়েমেন যুদ্ধ অবসানের ক্ষেত্রেও একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ আগে থেকেই আশা প্রকাশ করে আসছিলেন।

 

ইসমাইল বাঘেইয়ের এই প্রকাশ্য ঘোষণার মাধ্যমে সেই আশার পালে নতুন করে হাওয়া লেগেছে। ইরান যদি সত্যিই ইয়েমেনের বর্তমান প্রশাসন এবং সৌদি জোটের মধ্যে একটি সম্মানজনক ও স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে সহায়তা করতে পারে, তবে তা সমগ্র আরব উপদ্বীপের জন্য এক ঐতিহাসিক শান্তির দ্বার উন্মোচন করবে।

 

তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসমাইল বাঘেইয়ের এই যুগান্তকারী বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইয়েমেনের সাধারণ জনগণ বছরের পর বছর ধরে ক্ষুধা, চরম দারিদ্র্য, এবং মহামারীর মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সঙ্গে নিরলস লড়াই করছে।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের ওপর থেকে সব ধরনের অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে। ইরানের এই সময়োপযোগী কূটনৈতিক উদ্যোগ যদি সত্যিকার অর্থে আলোর মুখ দেখে, তবে তা শুধু একটি বড় রাজনৈতিক বিজয়ই হবে না, বরং লাখো ইয়েমেনি শিশুর জন্য একটি নিরাপদ নতুন সকাল বয়ে আনবে।

 

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে বিবেচনা করলেও এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দ্রুত অবসান বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে গঠনমূলক আলোচনা ও মানবিক সহায়তার পথ সুগম করার মাধ্যমেই কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জাতিকে পুনরায় নিজের পায়ে দাঁড় করানো সম্ভব।

 

ইয়েমেন সংকট সমাধানে শুধু আঞ্চলিক দেশগুলো নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও একটি বড় নৈতিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বহুবার ইয়েমেনে কার্যকর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিলেও তা বারবার নানা কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে।

 

ইরানের বর্তমান এই কূটনৈতিক প্রস্তাব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সেই অসম্পূর্ণ কাজকে চূড়ান্ত রূপ দিতে বিপুলভাবে সহায়ক হতে পারে। বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো যদি এই অঞ্চলে তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোকে সত্যিকারের অগ্রাধিকার দেয়, তবে তেহরান ও রিয়াদের যৌথ উদ্যোগে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করা মোটেও অসম্ভব কোনো বিষয় নয়।

 

 

এক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোরও উচিত অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে এই মর্মান্তিক যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত না করে, বরং আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর এই ধরনের গঠনমূলক শান্তি উদ্যোগকে সর্বাত্মকভাবে সমর্থন করা।

 

শুধু মানবিক বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বরং বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থের বিবেচনাতেও ইয়েমেন যুদ্ধের দ্রুত অবসান সমগ্র অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত জরুরি। লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্য রুটগুলো ইয়েমেনের ভৌগোলিক সীমানার ঠিক পাশেই অবস্থিত।

 

এই সংবেদনশীল অঞ্চলে অব্যাহত অস্থিরতা গোটা বিশ্ব বাণিজ্যের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সৌদি আরব বর্তমানে তাদের অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে, যার জন্য একটি শান্ত, নিরুপদ্রব ও স্থিতিশীল প্রতিবেশী রাষ্ট্র তাদের নিজেদের অর্থনীতির জন্যই অপরিহার্য।

 

অন্যদিকে, ইয়েমেনকেও তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতীয় অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করতে হবে। এমন বাস্তবতায়, ইরানের এই মধ্যস্থতার প্রস্তাব একটি দূরদর্শী এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত হচ্ছে, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করতে এবং আঞ্চলিক পারস্পরিক সহযোগিতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

 

পরিশেষে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরিতার অবসান ঘটাতে ইরানের এই সদিচ্ছা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

 

এখন পুরো বিশ্বের নজর থাকবে এই বিষয়টির দিকে যে, সৌদি আরব এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো তেহরানের এই বন্ধুত্বপূর্ণ প্রস্তাবকে কীভাবে গ্রহণ করে। যদি সব পক্ষ নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক অহংকার এবং পূর্বশত্রুতা ভুলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আন্তরিক সংলাপে বসতে রাজি হয়, তবে ইয়েমেনের আকাশে জমে থাকা বারো বছরের কালো যুদ্ধ-মেঘ খুব দ্রুতই চিরতরে সরে যাবে। কূটনীতি, অসীম ধৈর্য এবং পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার মহান মানসিকতাই পারে মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘতম এবং মর্মান্তিক অধ্যায়ের একটি সম্মানজনক ও শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি টানতে।

 

- তাসনিম নিউজ এজেন্সি