রবিবার, অক্টোবর ১৮, ২০২৬
৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শর্ত মানলে সাত দিনেই খুলবে হরমুজ প্রণালি, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:১০ পিএম

শর্ত মানলে সাত দিনেই খুলবে হরমুজ প্রণালি, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান
ছবি : Collected

বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। টানা আট মাস ধরে চলা সংঘাত এবং বহুমুখী কূটনৈতিক অচলাবস্থার পর ইরান এবার সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একটি সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ প্রস্তাব ছুড়ে দিয়েছে।

 

তেহরানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তাদের দেওয়া যৌক্তিক শর্তগুলো মেনে নেওয়া হলে মাত্র সাত দিনের মধ্যেই এই অবরুদ্ধ প্রণালিটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।

 

গত কয়েক মাস ধরে এই প্রণালিটি বন্ধ থাকার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটেছে, তার অবসানে এই প্রস্তাবটি একটি যুগান্তকারী মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রোববার দেশটির জাতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাৎকারে দৃঢ়তার সঙ্গে নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া তাদের এই প্রস্তাবটি এখনও আলোচনার টেবিলে সম্পূর্ণ বহাল রয়েছে।

 

তিনি এই গভীর বৈশ্বিক সংকট নিরসনে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ পুনরায় স্বাভাবিক করতে যুক্তরাষ্ট্রকে আর কোনো কালক্ষেপণ না করে দ্রুত এই প্রস্তাব মেনে নেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

 

সাম্প্রতিক এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির সূত্রপাত ঘটে বেশ কয়েক মাস আগে, তবে তা এক নতুন মাত্রা পায় গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। ওই সময়ে দুই দেশের মধ্যে চলমান এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরসনে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় সেই উদ্যোগটি সাময়িক আশার সঞ্চার করলেও, শেষ পর্যন্ত তা দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভেস্তে যায়। সেই যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ হওয়ার পরপরই মূলত ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার এই সাত দিনের প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক মহলের সামনে উত্থাপন করেছিল।

 

গত সপ্তাহে তেহরানের শীর্ষ নিরাপত্তা প্রধান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে, তারা ওয়াশিংটনের কাছ থেকে এই প্রস্তাবের বিপরীতে একটি প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন। তবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানের পক্ষ থেকে যে সাতটি সুনির্দিষ্ট শর্ত দেওয়া হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র সেগুলো পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ায় এবং কোনো গঠনমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ায় দুপক্ষের মধ্যকার আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল।

 

এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচির এই নতুন ও সরাসরি বার্তার মাধ্যমে সেই থমকে থাকা আলোচনা পুনরায় গতি পাওয়ার একটি ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশনের (ওআইসি) এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিতে বর্তমানে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অবস্থান করছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

 

সেখানে এক ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি প্রস্তাবটির বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং ইরানের অনড় অবস্থানের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। আরাঘচি বলেন, "আমরা এই সামরিক ও অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রকে যে সাত দিনের একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দিয়েছি, তার ওপর ভিত্তি করেই আমাদের বর্তমান অবস্থান সম্পূর্ণ পরিষ্কার এবং সুনির্ধারিত।

 

মার্কিন প্রশাসন ইতোমধ্যে আমাদের প্রস্তাবের বিপরীতে তাদের নিজস্ব মতামত জানিয়েছে; যা আমরা বর্তমানে আমাদের জাতীয় ও আঞ্চলিক স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যালোচনা করছি।

 

তবে আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বিশ্ববাসীকে জানাতে চাই, আমাদের সেই মূল প্রস্তাবটি এখনও আলোচনার টেবিলে পুরোপুরি বহাল রয়েছে।" মার্কিন প্রশাসনের কূটনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের যদি বিন্দুমাত্র রাজনৈতিক সততা থাকে, যা নিয়ে আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে এবং বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই, তাহলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পথ একেবারেই স্পষ্ট এবং সবার জন্য উন্মুক্ত।"

 

ইরানের দেওয়া এই প্রস্তাবের গভীরে রয়েছে তাদের নিজস্ব জাতীয় অর্থনীতি পুনর্গঠন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি। তেহরানের দেওয়া শর্তগুলোর মধ্যে অন্যান্য প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক দাবির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর।

 

প্রথমত, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে একতরফা ও দীর্ঘমেয়াদি নৌ-অবরোধ আরোপ করে রেখেছে, তা অবিলম্বে এবং নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার করতে হবে, যাতে ইরানের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়।

 

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটির জ্বালানি তেল রপ্তানির ওপর থেকে সকল প্রকার মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণভাবে তুলে নিতে হবে। ইরানের অর্থনীতি মূলত তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, তাই এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার তাদের জন্য জীবন-মরণ প্রশ্ন।

 

এবং তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যসহ আঞ্চলিক সমস্ত ফ্রন্টে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন মিত্রদের যে ধারাবাহিক বৈরীতা, প্রক্সি যুদ্ধ ও সামরিক আগ্রাসন চলছে, তার চিরস্থায়ী অবসান ঘটাতে হবে। ইরানের নীতিনির্ধারকদের মতে, এই শর্তগুলো কোনোভাবেই অযৌক্তিক বা অতিরঞ্জিত নয়, বরং এগুলো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বাভাবিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এবং নাগরিকদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা দেওয়ার ন্যূনতম অধিকার।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি তার এই সাক্ষাৎকারে সংকট সমাধানের একটি সুনির্দিষ্ট ও পর্যায়ক্রমিক রূপরেখাও প্রদান করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন যদি তেহরানের দেওয়া এই যৌক্তিক শর্তগুলো মেনে নিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মত হয়, তবে চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ছয় দিনের মাথায় অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালিটি পুনরায় সকল দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ ও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া সম্ভব।

 

আর এর ঠিক পরদিনই, অর্থাৎ সপ্তম দিনে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হতে পারে। এটি মূলত বর্তমানের এই যুদ্ধাবস্থা থেকে উত্তরণের একটি অত্যন্ত সুগঠিত ও যৌক্তিক কূটনৈতিক নকশা, যা ইরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছে।

 

তবে এই জটিল সংকটের সমাধানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন অগ্রাধিকার এবং নীতিগত অবস্থান। শুরু থেকেই দুই দেশের মধ্যে এই চলমান আট মাসের দীর্ঘ বিরোধের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি।

 

যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো আলোচনার শুরুতেই এই সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে দরকষাকষি করতে বদ্ধপরিকর। চলতি মাসের শুরুর দিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার দাবি পূরণ করতে এবং দুই দেশের মধ্যে চলমান এই বিধ্বংসী যুদ্ধের চূড়ান্ত অবসান ঘটাতে চাইলে ইরানকে অবশ্যই তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে এবং দৃশ্যমান হারে হ্রাস করতে হবে।

 

মার্কিন প্রশাসনের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের চরম ঝুঁকি না কমালে ইরানকে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক ছাড় বা অবরোধ প্রত্যাহারের সুবিধা দেওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে তেহরানের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্নমুখী।

 

তারা বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলছে যে, পারমাণবিক ইস্যুর চেয়ে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো আলোচনার শুরুতেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ও নৌ চলাচলের পূর্ণ নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার দিকে মনোযোগ দেওয়া।

 

তাদের মতে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সামরিক অবরোধের অবসান ছাড়া পারমাণবিক বা অন্য কোনো বিষয়ে কোনো অর্থবহ আলোচনা সম্ভব নয়। হরমুজ প্রণালির এই অবরোধ সমগ্র বিশ্বের জন্য ঠিক কেন এত বেশি উদ্বেগজনক, তা এর ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনা করলেই অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

 

এই চলমান যুদ্ধ এবং অবরোধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। এটি মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ দেশগুলোর সঙ্গে বিশ্ববাজারের সংযোগ স্থাপনের প্রধান ও অবিচ্ছেদ্য ধমনী।

 

ফলে এই প্রণালি দীর্ঘ আট মাস ধরে বন্ধ থাকার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে নজিরবিহীন অস্থিরতা, সরবরাহ ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়েছে, তা উন্নত বিশ্ব থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল-বিশ্বের প্রতিটি দেশের অর্থনীতিকেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

 

এখন দেখার বিষয়, পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব অর্থনীতির এই ধারাবাহিক রক্তক্ষরণ থামাতে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বৃহত্তর স্বার্থে ইরানের দেওয়া এই শর্তগুলো মেনে নেয় কি না। আন্তর্জাতিক মহল ও বাজার বিশ্লেষকরা গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে এই কূটনৈতিক দরকষাকষির দিকে তাকিয়ে আছেন, কারণ এর ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী শান্তির ভবিষ্যৎ। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের মূল প্রতিবেদন অনুযায়ী, কূটনৈতিক এই দাবা খেলায় বল এখন পুরোপুরি ওয়াশিংটনের কোর্টে।

 

- রয়টার্স