এ পরিস্থিতিতে, সংঘাত নিরসনে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) গৃহীত কোনো প্রস্তাবে যদি পর্যাপ্ত ন্যায্যতা এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় না থাকে, তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান তাতে কোনোভাবেই সমর্থন প্রদান করবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।
ইরাকের রাজধানী বাগদাদে চলমান ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের ৫২তম শীর্ষ বৈঠকের ফাঁকে রোববার, ১৮ অক্টোবর এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তেহরানের এই অনড় অবস্থানের কথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিয়েছেন।
তার এই দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য মূলত ইয়েমেন ইস্যুতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিরাজমান গভীর মতপার্থক্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনকেই নতুন করে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। আরাগচির মতে, কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট বা একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত কখনোই দীর্ঘমেয়াদী শান্তি বয়ে আনতে পারে না।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাগদাদে চলমান এই বহুপাক্ষিক সম্মেলনে ইয়েমেন ইস্যুতে একটি সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণের লক্ষ্যে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে জোর কূটনৈতিক আলোচনা ও দরকষাকষি অব্যাহত রয়েছে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, তেহরানের নিবিড় পর্যবেক্ষণে প্রস্তাবটির বর্তমান খসড়ায় যদি সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষের স্বার্থের প্রকৃত প্রতিফলন, যৌক্তিক ন্যায্যতা এবং কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য সুনিশ্চিত না হয়, তবে ইরান এই প্রস্তাবের সঙ্গে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করবে না।
আব্বাস আরাগচি বলেন, "আমরা আন্তরিকভাবে আশা করি যে, এই প্রস্তাব এবং সম্মেলনের চূড়ান্ত বিবৃতিতে একটি যৌক্তিক ন্যায্যতা ও রাজনৈতিক ভারসাম্য কঠোরভাবে বজায় রাখা হবে। আর যদি তা নিশ্চিত করা না হয়, তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পক্ষে এই আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবে যোগ দেওয়া বা সম্মতি জ্ঞাপন করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।"
ওআইসির এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শীর্ষ বৈঠকে ইয়েমেনের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অত্যন্ত গভীর ও খোলামেলা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সংঘাতে অন্যতম প্রধান অংশীজন হিসেবে সৌদি আরব সম্মেলনে তাদের নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান ও মতামত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে।
এর পাশাপাশি ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য প্রভাবশালী দেশগুলোও ইয়েমেন বিষয়ে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছে। তবে ব্যাপক মতপার্থক্যের কারণে প্রস্তাবটির চূড়ান্ত খসড়া এখনো সর্বসম্মতভাবে প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওআইসির ৫৭টি সদস্য দেশের মধ্যে একটি বৃহৎ অংশের রাজনৈতিক অবস্থান ঐতিহাসিকভাবেই রিয়াদ বা সৌদি আরবের কাছাকাছি। এই কূটনৈতিক প্রতিকূলতা এবং শক্তির ভারসাম্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত থেকেও তেহরান নিজেদের যৌক্তিক অবস্থান সুসংহত করতে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ব্যাপক ও নিরবচ্ছিন্ন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে আরাগচি উল্লেখ করেছেন।
ইয়েমেনের এই ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শেকড় প্রোথিত রয়েছে এক দশকেরও বেশি সময় আগের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্যে। ২০১৪ সালে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা যখন ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং এর পার্শ্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়, মূলত তখন থেকেই দেশটিতে এক দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়।
পরবর্তীতে ২০১৫ সালে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারকে পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসানোর লক্ষ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী সামরিক জোট দেশটিতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে।
তবে বছরের পর বছর ধরে চলা এই সর্বাত্মক সামরিক অভিযান সত্ত্বেও সংকটের কোনো টেকসই বা স্থায়ী সমাধান অর্জিত হয়নি; বরং এটি বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে, যেখানে লাখ লাখ নিরীহ মানুষ চরম দুর্ভিক্ষ, মহামারি এবং বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের এই সংঘাত কেবল দেশটির ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই আর আবদ্ধ নেই, বরং তা সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সমগ্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করছে।
বিশেষ করে চলতি বছরের জুলাই মাসে হুথি বিদ্রোহীরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর ও সংলগ্ন সমুদ্রপথে সামুদ্রিক নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।
এর পরপরই তারা সৌদি আরবের অভ্যন্তরে একের পর এক অত্যাধুনিক ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এসব ভয়াবহ হামলায় সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি তেল শোধনাগার এবং অন্যান্য কৌশলগত রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোকে প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়, যা কেবল রিয়াদের জাতীয় নিরাপত্তাকেই বিঘ্নিত করেনি, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এক গভীর উদ্বেগ ও ব্যাপক অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে।
সম্মেলনে ইয়েমেন ইস্যুর পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান তীব্র কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন আব্বাস আরাগচি। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ বর্তমানে এক চরম আকার ধারণ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা এবং চলমান অচলাবস্থা নিরসনের বিষয়ে আরাগচি জানান যে, তেহরান ইতিমধ্যে তাদের সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক শর্তগুলো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরেছে।
এটি মূলত সংকট সমাধানের লক্ষ্যে ইরানের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত একটি সুচিন্তিত 'সাত দিনের পরিকল্পনা'-এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইরানের এই প্রস্তাবের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রও তাদের নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান ও মতামত তেহরানকে জানিয়েছে।
বর্তমানে ইরানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহল মার্কিন বক্তব্যের অত্যন্ত সতর্ক ও চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে এবং এর একটি উপযুক্ত ও গঠনমূলক জবাব দেওয়ার জন্য জোর প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ইরানের প্রস্তাবিত এই 'সাত দিনের পরিকল্পনা' বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য ঠিক কতটা তাৎপর্যপূর্ণ, তা আরাগচির বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, "আমাদের কৌশলগত দৃষ্টিতে সংকট নিরসনের এই সাত দিনের পরিকল্পনাটি এখনো আলোচনার টেবিলে সম্পূর্ণভাবে বহাল রয়েছে। এখন বল পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি সমস্যা সমাধানের বিন্দুমাত্র সদিচ্ছা ও রাজনৈতিক আন্তরিকতা প্রদর্শন করা হয়, তবে উভয় দেশের জন্যই একটি সম্মানজনক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ একেবারেই পরিষ্কার।"
তিনি এই পরিকল্পনার শর্তগুলো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রথম পাঁচ দিনের মধ্যে ইরানের দেওয়া যৌক্তিক শর্তগুলো, যার মধ্যে অন্যতম হলো অন্যায় অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করা, পুরোপুরি পূরণ করে, তবে ষষ্ঠ দিনে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য শর্তহীনভাবে খুলে দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়। আর এর ঠিক পরদিন, অর্থাৎ সপ্তম দিনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু হবে।
এদিকে, বাগদাদে চলমান ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের এই ৫২তম অধিবেশন সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এই ঐতিহাসিক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে তুরস্কের কাছ থেকে পরবর্তী মেয়াদের জন্য ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের ঘূর্ণায়মান সভাপতির অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেছে ইরাক।
বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করছেন। সম্মেলনের মূল আলোচ্য সূচিতে ইয়েমেন সংকটের পাশাপাশি ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় চলমান ভয়াবহ ইসরায়েলি আগ্রাসন, ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্পর্শকাতর বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ ও সুদৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করা এই সম্মেলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পরিশেষে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ইরাকের সঙ্গে ইরানের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের গভীরতার কথা অত্যন্ত প্রশংসার সঙ্গে স্মরণ করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তেহরান সর্বদা বাগদাদকে বিশেষ গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার প্রদান করে থাকে। আরাগচি অত্যন্ত আশাবাদী কণ্ঠে এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন যে, ওআইসির শীর্ষ পদে নতুন মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ এবং পরিষদের সভাপতি হিসেবে ইরাকের বলিষ্ঠ ও গতিশীল নেতৃত্ব এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটির কার্যক্রমে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
একই সঙ্গে, মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বিরাজমান দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিরোধ মেটাতে এবং একটি ঐক্যবদ্ধ, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য বিনির্মাণে ওআইসি ভবিষ্যতে আরও গঠনমূলক, নিরপেক্ষ এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।