সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৩০ বছর বয়সে পবিত্র হজ পালনকারী আলজেরীয় নারী সারহুদার ইন্তেকাল

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম

১৩০ বছর বয়সে পবিত্র হজ পালনকারী আলজেরীয় নারী সারহুদার ইন্তেকাল
ছবি : Collected

জীবনের এক সুদীর্ঘ, বর্ণিল ও ঘটনাবহুল পথচলা শেষে চিরবিদায় নিলেন আলজেরিয়ার ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি এবং দেশটির সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ নারী হাজ্জা সারহুদা সিতিতি। প্রচলিত সরকারি নথিপত্র এবং পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, মৃত্যুকালে এই মহীয়সী নারীর বয়স হয়েছিল ১৩২ বছর।

 

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক স্বনামধন্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়া তাদের সম্প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পেজে এই প্রবীণ নারীর পবিত্র হজ পালনের একটি বিশেষ, দুর্লভ ও আবেগঘন ভিডিওচিত্র পুনরায় শেয়ার করার মধ্য দিয়ে তার মৃত্যুর খবরটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে।

 

তার এই জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে যেন উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়ার এক সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক অধ্যায়ের চিরস্থায়ী সমাপ্তি ঘটল। বয়সের ভারে শরীর ন্যুব্জ হয়ে গেলেও অবিচল ঈমান এবং প্রবল মানসিক ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি জীবনের অন্তিম লগ্নে এসে পবিত্র হজ পালনের মতো অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টসাধ্য একটি ইবাদত সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন।

 

তার সেই ঐকান্তিক ভক্তি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে গভীর বিস্ময় ও আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণার জন্ম দিয়েছিল। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আলজেরিয়াসহ সমগ্র আরব ও মুসলিম বিশ্বে এক গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

 

হাজ্জা সারহুদা সিতিতির দীর্ঘ জীবনের শুরুটা হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষ ভাগে, যখন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বা জীবনযাত্রার বর্তমান মানদণ্ড মানুষের কল্পনারও বাইরে ছিল। প্রাপ্ত ঐতিহাসিক ও পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮৯৪ সালে আলজেরিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় গালমা প্রদেশের শিনিউ নামক এক নিভৃত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা অঞ্চলে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

 

তবে জীবনের এক বিশাল অংশ এবং শেষ দিনগুলো তিনি অতিবাহিত করেছেন তেবেসা নামক ঐতিহাসিক শহরে। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে, যখন তার বয়স মাত্র বিশ বছর, তখন তিনি প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি মেনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

 

এরপর দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তিনি একটি সুবিশাল, ঐতিহ্যবাহী ও একান্নবর্তী পরিবারের মূল বটবৃক্ষ হিসেবে পরম মমতায় দায়িত্ব পালন করেছেন। দাম্পত্য জীবনে তিনি পনেরোজন সন্তানের জননী হওয়ার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেন।

 

নিজের এতগুলো সন্তান, তাদের ঘরের অসংখ্য নাতি-নাতনি এবং পরবর্তীতে তাদেরও সন্তানদের নিয়ে এক পরিপূর্ণ, কোলাহলমুখর ও আনন্দময় পারিবারিক আবহে জীবনের সিংহভাগ সময় অতিবাহিত করেছেন এই নারী।

 

একটি আধুনিক ও যান্ত্রিক যুগে এসেও তিনি প্রাচীন আরবীয় পারিবারিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ঐক্যের এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। পরিবারের সদস্য ও সমাজের মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন বয়োজ্যেষ্ঠ নারীই ছিলেন না, বরং ছিলেন এক জীবন্ত ইতিহাস, প্রজ্ঞার ভান্ডার এবং অসীম শ্রদ্ধার এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

 

সারহুদা সিতিতির দীর্ঘ জীবনের সবচেয়ে আলোচিত, স্মরণীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনুপ্রেরণাদায়ক অধ্যায়টি রচিত হয় ২০২৪ সালের জুন মাসে। জন্মসূত্রে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসেবে পবিত্র মক্কা নগরীতে গিয়ে স্বচক্ষে কাবা ঘর দর্শন এবং হজ পালন করার পবিত্র স্বপ্ন তার হৃদয়ে প্রোথিত ছিল দীর্ঘকাল ধরে।

 

অবশেষে জীবনের গোধূলি লগ্নে, ১৩০ বছর বয়সে এসে তিনি তার সেই পরম আরাধ্য স্বপ্ন পূরণে সক্ষম হন। এত বেশি বয়সে, যখন মানুষের স্বাভাবিক হাঁটাচলার ক্ষমতা বা শারীরিক ভারসাম্য প্রায় সম্পূর্ণভাবে লোপ পায়, তখন তিনি বার্ধক্যজনিত শারীরিক দুর্বলতাকে হার মানিয়ে প্রবল আধ্যাত্মিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে পবিত্র হজব্রত পালন করেন।

 

মক্কার তীব্র গরম এবং হজ পালনের কঠোর শারীরিক পরিশ্রম তাকে বিন্দুমাত্র ক্লান্ত করতে পারেনি। সেই সময় সৌদি আরবের মূলধারার গণমাধ্যম থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে তার এই অসামান্য কীর্তি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রথম সারির সংবাদ হিসেবে প্রচারিত হয়।

 

হুইলচেয়ারে বসে কাবা শরিফ তাওয়াফ করা, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা এবং হাসিমুখে মহান স্রষ্টার ইবাদতে মগ্ন থাকার সেই নৈসর্গিক দৃশ্য বিশ্ববাসীকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, এই ঐতিহাসিক হজের আগে তিনি তার সুদীর্ঘ জীবনে আরও দুইবার পবিত্র ওমরাহ পালন করার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।

 

তবে ১৩০ বছর বয়সে তার এই হজ পালন কেবল তার ব্যক্তিগত জীবনেরই একটি বড় অর্জন ছিল না, বরং তা সারা বিশ্বের অগণিত বয়স্ক, অসুস্থ এবং হতাশগ্রস্ত মানুষের জন্য এক অনন্য মানসিক শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করেছে।

 

১৮৯৪ সালের জন্মসনটিকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অনুমেয় যে, সারহুদা সিতিতির দীর্ঘ জীবদ্দশায় আলজেরিয়া, আফ্রিকা মহাদেশ এবং সমগ্র বিশ্বের বুকে অভাবনীয় সব ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে।

 

তিনি ঠিক এমন এক বিরূপ সময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যখন সমগ্র আলজেরিয়া ফরাসি সাম্রাজ্যবাদের একনিষ্ঠ উপনিবেশ হিসেবে নির্মমভাবে শৃঙ্খলিত ছিল। তার শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের বর্ণিল দিনগুলো কেটেছে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের চরম নিপীড়ন, অর্থনৈতিক শোষণ এবং পরাধীনতার গ্লানির মধ্য দিয়ে।

 

তিনি নিজ চোখে দেখেছেন কীভাবে একটি পরাধীন ও স্বাধীনতাকামী জাতি দশকের পর দশক ধরে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং জন্মভূমির অধিকার আদায়ের জন্য অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করে লড়াই করেছে। ১৯৫৪ সালে শুরু হওয়া আলজেরিয়ার রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং দীর্ঘ আট বছরের বিভীষিকাময় ও প্রাণঘাতী যুদ্ধের একজন প্রত্যক্ষ ও নীরব সাক্ষী ছিলেন তিনি।

 

১৯৬২ সালে যখন আলজেরিয়ার বীর মুক্তিকামী জনতা চূড়ান্তভাবে ফরাসিদের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য ছিনিয়ে আনে, তখন তিনি একজন পরিণত বয়সের নারী। দেশের সেই ঐতিহাসিক মহাবিজয় এবং লাখো শহীদের আত্মত্যাগের করুণ ইতিহাস তার তীক্ষ্ণ স্মৃতিতে অম্লান ছিল আজীবন।

 

আশ্চর্যের বিষয় হলো, আলজেরিয়ায় ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসন টিকে ছিল ঠিক ১৩২ বছর, আর এই মহীয়সী নারীও ঠিক ১৩২ বছর বয়সেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। কেবল দেশের স্বাধীনতাই নয়, স্বাধীনতা-পরবর্তী কয়েক দশকের রাজনৈতিক উত্থান-পতন, সামাজিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক পটপরিবর্তন এবং একটি আধুনিক আলজেরিয়ার তিলে তিলে গড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপের এক জীবন্ত প্রামাণ্য দলিল ছিলেন সারহুদা।

 

দুটি ধ্বংসাত্মক বিশ্বযুদ্ধ, বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদের পতন এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ-সবকিছুরই চাক্ষুষ প্রমাণ নিয়ে তিনি বেঁচে ছিলেন এক শতাব্দীরও অনেক বেশি সময়। তেবেসা শহরে পরিবারের অসংখ্য সদস্যের পরম স্নেহ, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মাঝে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করা এই মহীয়সী নারীর বর্ণাঢ্য জীবনকাহিনি আলজেরিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত গভীর ও আবেগপূর্ণ তাৎপর্য বহন করে।

 

তার এই সুদীর্ঘ জীবন কেবল একটি নিছক সংখ্যার হিসাব বা ব্যক্তিগত মাইলফলক নয়, বরং তা একাধিক প্রজন্মের নিরবচ্ছিন্ন রূপান্তর এবং একটি দেশের গৌরবময় ইতিহাসের নানা কণ্টকাকীর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

 

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সারহুদা সিতিতির মতো শতায়ু প্রবীণ মানুষেরা যেকোনো সমাজ ও রাষ্ট্রের সেই অমূল্য সম্পদ, যাদের শেকড় ছড়িয়ে থাকে ইতিহাসের অনেক অচেনা গভীরে। তার চিরবিদায়ের মধ্য দিয়ে আলজেরিয়ার নাগরিকরা কেবল তাদের দেশের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষকেই হারাল না, বরং হারাল এমন এক প্রজ্ঞাবান ও অভিজ্ঞ অভিভাবককে যিনি দেশের অতীত ইতিহাস এবং বর্তমান প্রজন্মের মাঝে একটি জীবন্ত সেতুবন্ধন হিসেবে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছিলেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষ তার আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তার জীবনের অবিচল ধৈর্য, ধর্মের প্রতি অকৃত্রিম আধ্যাত্মিক নিষ্ঠা এবং শতবর্ষের অমূল্য ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা আধুনিক আলজেরিয়া এবং আগামী প্রজন্মের কাছে এক অমূল্য শিক্ষা ও চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবে যুগের পর যুগ।