সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ২০তম নিয়মিত বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর অর্থনৈতিক পর্যালোচনার মানদণ্ডে বিচার করলে, বাংলাদেশ সরকারের এই পদক্ষেপ মূলত অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং পরোক্ষভাবে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষার একটি সমন্বিত ও কৌশলগত প্রয়াস হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
বৈঠক সমাপ্ত হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর আইনি কাঠামোর আওতায় নিম্নস্তরের সিগারেটের এই ন্যূনতম মূল্য নতুন করে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই আইনি প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে কার্যকর করার জন্য সিগারেটের দাম নির্ধারণ এবং স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল ব্যবহার বিধিমালা-সংক্রান্ত দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপন সংশোধনের প্রস্তাবও মন্ত্রিসভায় সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন লাভ করেছে।
সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের মতে, বাজারে নিম্নস্তরের সিগারেটের অবৈধ কেনাবেচা এবং কর ফাঁকির প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল।
নতুন এই সংশোধিত মূল্যকাঠামো ও কঠোর নজরদারি বাস্তবায়িত হলে সেই রাজস্ব ঘাটতি অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে দৃঢ়ভাবে আশা করা হচ্ছে। সিগারেটের নতুন এই মূল্যস্তর এবং বাজারকাঠামো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রতি দশ শলাকা সিগারেটের মূল্যস্তর অনুযায়ী যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল, বর্তমান সিদ্ধান্তে সেখান থেকে শুধুমাত্র নিম্নস্তরের সিগারেটের মূল্যসীমা তিন টাকা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
এর ফলে দেশের বাজারে এখন থেকে নিম্নস্তরের দশ শলাকা সিগারেটের নতুন দাম হবে কমপক্ষে ৬৫ টাকা বা তার ঊর্ধ্বে। অন্যদিকে, ভোক্তাদের জন্য মধ্যম স্তরের সিগারেটের দাম আগের মতোই ৯২ টাকা বা তার বেশি, উচ্চ স্তরের সিগারেটের দাম ১৬০ টাকা বা তার বেশি এবং অতি-উচ্চ বা প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের দাম ২১০ টাকা বা তার বেশি-সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত থাকছে।
উল্লেখ্য যে, এর আগে বর্তমান অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রতি দশ শলাকার প্যাকেটে স্তরভেদে সিগারেটের দাম দুই টাকা থেকে শুরু করে পঁচিশ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছিল। সেই সময়ে নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা বর্তমান সংশোধনীর মাধ্যমে আরও একধাপ উন্নীত করা হলো।
সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ওই একই মন্ত্রিসভা বৈঠকে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের টেকসই বিকাশে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
দেশে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়াতে এর জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে বিশেষ শুল্ক-কর রেয়াত বা ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।
সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে শুরু করে পরবর্তী ১৮০ দিন বা ছয় মাস পর্যন্ত এসব নির্দিষ্ট ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে মাত্র এক শতাংশের অতিরিক্ত যাবতীয় আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর, আগাম কর এবং অগ্রিম আয়কর প্রদান থেকে আমদানিকারকদের সম্পূর্ণভাবে অব্যাহতি দেওয়া হবে।
জ্বালানি ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের এই নীতিগত সহায়তা দেশে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার প্রসারে একটি বড় ধরনের আর্থিক প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমিয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
উপরোক্ত বিষয়গুলোর বাইরেও, দেশের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ব্যাপক হারে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ এবং হংকংয়ের মধ্যে বিনিয়োগ সুরক্ষা ও সম্প্রসারণ বিষয়ক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তাবও এই মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তিটির প্রাথমিক মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে দশ বছর। দেশীয় অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা অত্যন্ত আশাবাদী যে, আইনি সুরক্ষাসংবলিত এই চুক্তির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হংকং থেকে বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
এর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হওয়া, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বিপুল সংখ্যক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও এই যুগান্তকারী চুক্তি এক সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা চূড়ান্ত বিচারে বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতিকে আরও বেশি শক্তিশালী ও মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।