উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, প্রাণ বাঁচাতে শৌচাগারে আশ্রয় নেওয়া এক দম্পতিকে তাঁরা একে অপরকে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় মৃত দেখতে পান, যা উদ্ধারকাজে যুক্ত ব্যক্তিদেরও গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
উদ্ধার অভিযানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ শোয়েব গণমাধ্যমকে জানান, হোটেলের একটি শৌচাগারের বদ্ধ দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তিনি ওই দম্পতিকে দেখতে পান। নারীটি কমোডে এবং পুরুষটি পাশের একটি চেয়ারে বসে তাঁকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ছিলেন।
মূলত লেলিহান শিখা ও বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে বাঁচতেই তাঁরা সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। শোয়েব অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে জানান, ওই যুগল আগুনে পুড়ে নয়, বরং অতিরিক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
মোহাম্মদ শোয়েবের সঙ্গে এই বিপজ্জনক উদ্ধারকাজে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছিলেন আশরাফ খান এবং মোহাম্মদ আফজাল। কোনো ধরনের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই তাঁরা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ভবনে প্রবেশ করেন।
হোটেলের অভ্যর্থনা কক্ষের কাছে এক তরুণীর সম্পূর্ণ ঝলসে যাওয়া মরদেহ এবং হুইলচেয়ারে বসা অবস্থায় আরেক ব্যক্তির নিথর দেহ উদ্ধার করেন তাঁরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ভবনটির কাঠামোগত ত্রুটি এই প্রাণহানির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
মূল সিঁড়িটি ভবনের একেবারে মাঝখানে অবস্থিত ছিল এবং জরুরি অবস্থায় বাইরে বের হওয়ার কোনো বিকল্প পথ বা ইমার্জেন্সি এক্সিট ছিল না। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বহু অতিথি ভেতরে আটকা পড়েন।
কয়েকজন বিদেশি নাগরিক চরম আতঙ্কে প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে ছাদ থেকে নিচে লাফ দেন। সেই সংকটময় মুহূর্তে স্থানীয় বাসিন্দা রিয়াজুদ্দিন মনসুরি ও তাঁর ছেলে আরমান ভবনের নিচে ২০ থেকে ২২টি তোশক বিছিয়ে দেন, যাতে লাফিয়ে পড়া মানুষেরা নিরাপদে নামতে পারেন।
এই মানবিক পদক্ষেপে তাঁদের প্রায় দুই লাখ রুপি আর্থিক ক্ষতি হলেও তাঁরা মানুষের জীবন বাঁচানোকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, বুধবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে হোটেলের ভূগর্ভস্থ তলে বা বেসমেন্টে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়।
সে সময় অধিকাংশ অতিথি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। খবর পেয়ে দমকল বাহিনীর ১৭টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে দীর্ঘ চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অন্তত ৫৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।
তদন্তে হোটেল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও গুরুতর অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। ভবনটিতে যাতায়াতের জন্য মাত্র একটি পথ ছিল এবং অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো বৈধ অনুমোদন বা ছাড়পত্র ছিল না।
এছাড়া মাত্র ছয়টি কক্ষ পরিচালনার আইনি অনুমোদন থাকলেও সেখানে অবৈধভাবে পঁচিশটি কক্ষ পরিচালিত হচ্ছিল। মর্মান্তিক এই ঘটনার পর পুলিশ হোটেলের মালিক লভকেশ বাজাজকে গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেছেন, ঘটনার সময় চরম আতঙ্কে তিনি নিজের জ্বলন্ত হোটেলের সামনে দিয়েই গাড়ি চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন।