শুক্রবার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) পক্ষ থেকে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, এখন থেকে সীমান্তে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের পাশাপাশি সমন্বিত টহল কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চার দিনব্যাপী বিজিবি-বিএসএফ শীর্ষ বৈঠকের পর এই ঐকমত্যে পৌঁছায় দুই প্রতিবেশী দেশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠককে সৌহার্দ্যপূর্ণ, ইতিবাচক এবং ভবিষ্যৎমুখী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বাংলাদেশ সীমান্তে জোরপূর্বক অভিবাসীদের পুশ ইন করার অভিযোগ উঠছে ভারতের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যেকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
ঠিক এমন একটি স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতা গ্রহণের পর রাজ্য সরকারের ‘শনাক্তকরণ, তালিকা থেকে বাদ এবং বহিষ্কার’ নীতির কারণে নতুন করে সীমান্ত জটিলতা ও চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম সীমানা। ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে ক্ষমতাসীন বিজেপি অবৈধ অভিবাসন নিয়ে আগে থেকেই অত্যন্ত সোচ্চার।
তাদের অভিযোগ, বহু বাংলাদেশি মুসলিম ভারতে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে বসবাস করছেন এবং গত বছর থেকেই তাদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, এ ধরনের একতরফা ও জোরপূর্বক কর্মকাণ্ড বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে ভারতকে ইতোমধ্যে এক ডজনেরও বেশি আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
বিজিবি জানিয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহে দেশের সীমান্তে বেশ কয়েকটি পুশ ইনের চেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে। পরিস্থিতি সার্বিক নিয়ন্ত্রণে রাখতে বর্তমানে সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন, নিবিড় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং ড্রোনের মাধ্যমে অত্যাধুনিক টহল ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম চলতি সপ্তাহে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে সীমান্তে পুশ ইনের যেকোনো চেষ্টা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের চলমান প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বাংলাদেশ যখন সীমান্তে পুশ ইন রোধে নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়াতে ব্যাপকভাবে কাজ করছে, তখন গত মাসে ভারত সরকার অবৈধভাবে বসবাসকারী দুই হাজার আটশো ষাট জনের বেশি সন্দেহভাজনের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য ঢাকার কাছে অনুরোধ জানিয়েছে।
তবে নয়াদিল্লির সাম্প্রতিক বৈঠকে উভয় দেশের কর্মকর্তারা অবৈধ, অনিচ্ছাকৃত ও জোরপূর্বক সীমান্ত অতিক্রমের মতো বহুল আলোচিত বিষয়গুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।
যৌথ বিবৃতিতে মানবপাচার রোধ, সীমান্তে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি কমানো, চোরাচালান বন্ধ, সীমান্ত এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
উভয় পক্ষই সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পূর্ণ নিরাপত্তা বজায় রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান উন্নত করা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান বাড়াতেও তারা একমত হয়েছে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী নভেম্বরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বিজিবি ও বিএসএফের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পরবর্তী সীমান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।