সোমবার, জুন ২২, ২০২৬
৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে কোচিং সেন্টারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিহত অন্তত ১৩

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ জুন, ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম

ভারতে কোচিং সেন্টারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিহত অন্তত ১৩
ছবি : Collected

ভারতের উত্তর প্রদেশের রাজধানী লখনৌতে একটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবনে অবস্থিত একটি কোচিং সেন্টারে এক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার, ২২ জুন সংঘটিত এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

 

আগুনের লেলিহান শিখা ও প্রচণ্ড ধোঁয়ায় ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন বহু নিরপরাধ মানুষ ও শিক্ষার্থী। জীবন বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে লাফ দিতে দেখা যায়।

 

প্রায় এক ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর ও নিরলস উদ্ধার অভিযানের পর দমকল বাহিনীর কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। এই আকস্মিক ও ভয়াবহ ঘটনা সমগ্র ভারতজুড়ে গভীর শোক ও চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও এই মর্মান্তিক সংবাদটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রাথমিক বিবরণ অনুযায়ী, সোমবার ব্যস্ত সময়ে হঠাৎ করেই ওই তিনতলা ভবনটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়।

 

মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে এবং পুরো ভবনে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। ভবনটি লখনৌর একটি অত্যন্ত জনবহুল ও পরিচিত বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত। সেখানে ওই কোচিং সেন্টারটি ছাড়াও বেশ কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং পোষা প্রাণীর একটি দোকান ছিল।

 

আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, ভবনের ভেতরে থাকা মানুষেরা স্বাভাবিক পথ ব্যবহার করে দ্রুত বের হওয়ার কোনো সুযোগ পাননি। চারদিকে আতঙ্ক, চিৎকার ও হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে।

 

দমকল বাহিনীর বেশ কয়েকটি ইউনিট খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে ছুটে আসে এবং অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। দীর্ঘ এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে একটানা চেষ্টার পর তারা আগুন পুরোপুরি আয়ত্তে আনেন।

 

এরপর ভবনের ভেতর থেকে উদ্ধারকারী দল একে একে অন্তত ১৩টি নিথর মরদেহ উদ্ধার করে, যা উপস্থিত সবার হৃদয়কে গভীরভাবে ভারাক্রান্ত করে তোলে। অগ্নিকাণ্ডের সময়কার ভয়াবহতা ও মানুষের অসহায়ত্বের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওচিত্রে।

 

বাঁচার জন্য মানুষের আর্তনাদ ও মরিয়া চেষ্টার দৃশ্যগুলো ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ভবনের একটি ভাঙা জানালা দিয়ে এক ব্যক্তি প্রাণপণে বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। তিনি কোনোমতে কার্নিশ ধরে ঝুলে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করেন।

 

কিন্তু আগুনের প্রচণ্ড তাপ এবং বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। প্রথমে নিচে থাকা একটি বেড়ার ওপর এবং পরে সরাসরি মাটিতে আছড়ে পড়েন ওই ব্যক্তি।

 

স্থানীয় জনতা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে প্রেরণ করেন। বর্তমানে ওই ব্যক্তি গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আগুনের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে পাঁচ থেকে সাতজন শিক্ষার্থী ওপর থেকে নিচে লাফিয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মারাত্মকভাবে আঘাত পেয়েছেন এবং একজনের হাড় ভেঙে যাওয়ার খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এবং দমকল বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিশাল বাহিনী নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজের সার্বিক তদারকি শুরু করেন।

 

ভবনের ভেতরে ঠিক কতজন মানুষ আটকে পড়েছিলেন, সে সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া না গেলেও, উদ্ধারকারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন।

 

উদ্ধারকাজ দ্রুততর করতে এবং ভবনে জমে থাকা বিষাক্ত ধোঁয়া বের করে দিতে ভবনের বেশ কয়েকটি কাঁচের জানালা ভেঙে ফেলা হয়। উদ্ধারকারী দলের এই তাৎক্ষণিক ও সাহসী পদক্ষেপের কারণে বেশ কয়েকজনের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।

 

প্রশাসনিক স্তরে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে। ভবনটিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করছিল কি না, কিংবা সেখানে পর্যাপ্ত অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জরুরি নির্গমন পথ ছিল কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

 

এই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তিনি এক সরকারি বার্তায় নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

 

একইসঙ্গে তিনি প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, যেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করে তাদের সব ধরনের প্রয়োজনীয় আর্থিক ও চিকিৎসাজনিত সহায়তা প্রদান করা হয়।

 

সার্বিক পরিস্থিতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে এবং উদ্ধারকাজ তদারকি করতে উত্তর প্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী ব্রজেশ পাঠক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে এবং এর পেছনে কারো কোনো গাফিলতি প্রমাণিত হলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

এই দুর্ঘটনা বাণিজ্যিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থাকে আবারও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গভীর আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

 

- এনডিটিভি