প্রায় তেরো মাস আগে ঘটা ওই তীব্র লড়াইয়ে ভারতের ছয়জন সেনা সদস্য প্রাণ হারান। দীর্ঘ সময় পর সম্প্রতি এই প্রাণহানির খবর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ্যে আসার পর ভারতজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক রাজনৈতিক শোরগোল। বিরোধী দলগুলো সরকারের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
দেশের সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনা এক গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মঙ্গলবার ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।
দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের পদত্যাগ দাবি করেছেন। একই সঙ্গে, দেশের প্রকৃত তথ্য গোপন করে সংসদ ও জনগণকে বিভ্রান্ত করার দায়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সমগ্র দেশবাসীর কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
কংগ্রেসের অভিযোগ, জাতীয় নিরাপত্তার মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়কে সরকার নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে এবং দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীর জওয়ানদের আত্মত্যাগকে চরমভাবে অবমূল্যায়ন করেছে।
বিরোধী দল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ উত্থাপন করে বলা হয়েছে যে, গত ২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় বাহিনীর চার দিনব্যাপী এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাত সংঘটিত হয়। অত্যন্ত গোপনীয় এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সিন্দুর’।
এই দুঃসাহসিক সামরিক অভিযানে অংশ নিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পাঁচজন সাহসী সদস্য এবং বিমানবাহিনীর একজন চৌকস সদস্যসহ মোট ছয়জন বীর জওয়ান নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন। কিন্তু ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি সরকার সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দীর্ঘদিন ধরে এই সংবেদনশীল তথ্যটি দেশের সংসদ এবং আপামর জনগণের কাছ থেকে পুরোপুরি গোপন করে রেখেছিল।
কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের মতে, নিহত সেনাদের নাম ও আত্মত্যাগের খবর দীর্ঘ তেরো মাস পর প্রকাশ করার মাধ্যমে সরকার কেবল দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা সংসদকেই অন্ধকারে রাখেনি, বরং মাতৃভূমির সুরক্ষায় জীবন উৎসর্গকারী বীর জওয়ানদের প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় সম্মান ও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি থেকেও নির্লজ্জভাবে বঞ্চিত করেছে।
দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা এই শহীদদের প্রতি সরকারের এমন উদাসীনতা ও গোপনীয়তা সশস্ত্র বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেওয়ার শামিল বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও বিরোধী দলের নেতারা।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সামরিক বাহিনীর আত্মত্যাগের কথা এভাবে লুকিয়ে রাখা সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আত্মমর্যাদার পরিপন্থী বলে তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এই স্পর্শকাতর ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে একটি বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে কংগ্রেস।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেসের প্রাক্তন সেনা বিষয়ক বিভাগের চেয়ারম্যান ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল রোহিত চৌধুরী এবং অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার অনুমা আচার্য। তারা দুজনেই মোদি সরকারের এই প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে অনুমা আচার্য গভীর ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ভারতের পূর্ববর্তী সকল সরকার সর্বদা দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করা প্রতিটি সেনাসদস্যকে প্রকাশ্যে সর্বোচ্চ বীরের সম্মান জানিয়ে এসেছে।
কিন্তু বর্তমান সরকার কেবল নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে একটি হাতিয়ার হিসেবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। সাধারণ সৈনিকদের আবেগের সঙ্গে বারবার এই ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলে তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন।
একই সংবাদ সম্মেলনে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল রোহিত চৌধুরী ক্ষমতাসীন দল বিজেপির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে ভোটের রাজনীতিতে জওয়ানদের আবেগকে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে তাদের মহামূল্যবান জীবনের কোনো প্রকৃত মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
তিনি একটি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, যখন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সংসদে দাঁড়িয়ে কোনো সেনা সদস্য নিহত হননি বলে সম্পূর্ণ অসত্য ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রদান করছিলেন, তখন সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে ও হাততালি দিয়ে তাকে সমর্থন জানাচ্ছিলেন।
এই ধরনের অবিবেচক আচরণ ভারতের ঐতিহ্যবাহী সেনাবাহিনী এবং দেশের জন্য আত্মদানকারী শহীদদের জন্য চরম অপমানজনক বলে তিনি দাবি করেন। এর উপযুক্ত জবাব হিসেবে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংসদে বিশেষ অধিকার ভঙ্গের প্রস্তাব বা প্রিভিলেজ মোশন আনারও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের সূত্রমতে, এই বিতর্কটি বর্তমানে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। সামরিক বাহিনীর মতো একটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও দেশপ্রেমিক প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এহেন রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি এবং তথ্য গোপনের অভিযোগ ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আগামী দিনগুলোতে এই ইস্যুটি সংসদে এবং রাজপথে বিরোধী দলগুলোর প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, প্রবল চাপের মুখে থাকা মোদি সরকার এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করে এবং দেশের সাধারণ জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে কী ধরনের গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।