সোমবার, জুন ২৯, ২০২৬
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চীন সফরে যাচ্ছেন সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬, ০৪:৫৭ পিএম

চীন সফরে যাচ্ছেন সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চলমান চরম অস্থিরতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সৃষ্ট সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সৌদি আরব।

 

আঞ্চলিক সংঘাত এড়ানো, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে চলতি সপ্তাহেই দুই দিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে যাচ্ছেন সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ।

 

বৈশ্বিক রাজনীতির বর্তমান জটিল ও পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত এই সফরটি এমন এক সংকটময় সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন সম্পূর্ণ উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা জোরালোভাবে মনে করছেন, এশিয়া মহাদেশের অন্যতম পরাশক্তি এবং বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি চীনের সাথে সৌদি আরবের এই উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে এবং যেকোনো বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে একটি বড় ধরনের নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত বিবৃতির মাধ্যমে এই উচ্চ পর্যায়ের সফরের বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করা হয়েছে। ওই বিবৃতিতে সুস্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, চীনের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ওয়াং ইয়ের বিশেষ ও ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ আগামী মঙ্গলবার বেইজিংয়ে গিয়ে পৌঁছাবেন এবং বুধবার পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ পর্যায়ের সরকারি বৈঠকে সরাসরি অংশগ্রহণ করবেন।

 

এই সফরে দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালীকরণ, জ্বালানি বাণিজ্যের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিতকরণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন নতুন দিকগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে বলে কূটনৈতিক মহল দৃঢ়ভাবে আশা প্রকাশ করছে।

 

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সফরের ঠিক আগেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ও কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চরম সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাত দেখা দিয়েছে।

 

গত সপ্তাহান্তে ওই অঞ্চলে উভয় দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সরাসরি পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে, যা সমগ্র বিশ্বকে একটি বৃহত্তর সামরিক সংঘাত এবং সম্ভাব্য বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় ফেলে দেয়।

 

অথচ এই ঘটনার মাত্র কিছুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র রাষ্ট্র ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি বহুল প্রতীক্ষিত প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

 

এমনকি এই ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও টেকসই ও বাস্তবসম্মত পর্যায়ে নিয়ে যেতে নিরপেক্ষ রাষ্ট্র সুইজারল্যান্ডে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও রুদ্ধদ্বার আলোচনাও অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

 

কিন্তু সাম্প্রতিক এই অনাকাঙ্ক্ষিত পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা সেই শান্তি উদ্যোগের স্থায়িত্ব, কার্যকারিতা এবং সদিচ্ছা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনে নতুন করে গভীর সংশয় ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন উত্তেজনার পেছনের প্রকৃত প্রেক্ষাপট নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মূলত চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে এই অঞ্চলে একটি বড় ধরনের ও ধ্বংসাত্মক সংঘাতের সূচনা হয়েছিল।

 

সেই সময় থেকে শুরু হওয়া সর্বাত্মক যুদ্ধে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি সার্বভৌম দেশের ওপর সরাসরি ও অতর্কিত সামরিক হামলা পরিচালনা করে। মূলত যে সমস্ত আরব দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর বিমান বা নৌ ঘাঁটি অবস্থিত, সেগুলোকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু করেই ইরান এই আক্রমণগুলো চালিয়েছিল।

 

ইরানের সেই ভয়াবহ সামরিক আগ্রাসনের শিকার হওয়া দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি সৌদি আরব। এই নজিরবিহীন আক্রমণগুলো সৌদি আরবের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি মারাত্মক ও প্রত্যক্ষ হুমকির সৃষ্টি করেছিল এবং একই সাথে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে চরমভাবে বিঘ্নিত করেছিল।

 

ভয়াবহ এই সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির পাশাপাশি চলমান এই সংঘাতের ফলে সৌদি আরবের জাতীয় অর্থনীতিতেও একটি বিশাল ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বারবার সামরিক হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং সামরিক উত্তেজনার কারণে বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

 

এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যা দেশটির অর্থনীতিকে প্রবল ও অভাবনীয় চাপের মুখে ফেলে দেয়।

 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ভারসাম্য রক্ষা এবং নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষায় সৌদি আরবের জন্য বর্তমানে একটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও স্থিতিশীল উপসাগরীয় অঞ্চল নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

 

এই সংকটময় অবস্থায় চীনের মতো একটি বৃহৎ তেল ক্রেতা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী দেশের সাথে সম্পর্ক আরও নিবিড় করা এবং তাদের মধ্যস্থতার মাধ্যমে আঞ্চলিক সমস্যার একটি টেকসই সমাধানের পথ খোঁজা সৌদি আরবের পররাষ্ট্র নীতির একটি অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন থেকে এই সামগ্রিক ও জটিল বিষয়াবলি সম্পর্কে বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য জানা গেছে।

 

- আল জাজিরা