রবিবার, জুন ২৮, ২০২৬
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভিউ ও অর্থের লোভে নারীদের ধাক্কা দিয়ে গোপন ভিডিও ধারণ, গ্রেপ্তার ইউটিউবার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম

ভিউ ও অর্থের লোভে নারীদের ধাক্কা দিয়ে গোপন ভিডিও ধারণ, গ্রেপ্তার ইউটিউবার
ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয়তা ও অর্থ উপার্জনের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এই প্রতিযোগিতার বশবর্তী হয়ে ভিউ বা দর্শকসংখ্যার লোভে নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে।

 

নারীদের বহনকারী যানবাহনে ইচ্ছাকৃতভাবে ধাক্কা দিয়ে গোপনে ভিডিও ধারণ এবং তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগে এক ইউটিউবারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার, ২৮ জুন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করেছে, যা সচেতন মহলে ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

দিল্লির পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত ওই যুবকের নাম গুরমান সিং। তিনি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'রোড সেফটি ওয়ালা' এবং 'বাইকারঅনরোড৩৩' নামের অ্যাকাউন্ট ও ভিডিও চ্যানেল পরিচালনা করতেন।

 

মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং ভিডিও দ্রুত ভাইরাল করার কুৎসিত কৌশল হিসেবে তিনি রাস্তায় চলাচলকারী নারী মোটরসাইকেল আরোহী এবং নারী যাত্রীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতেন। তার মূল অপরাধের ধরনটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং প্রতারণাপূর্ণ।

 

গুরমান রাস্তায় নারীদের স্কুটি বা মোটরসাইকেলের পেছনে নিজের যান দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ধাক্কা দিতেন। এরপর আশপাশের লোকজনের সন্দেহ এড়াতে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অত্যন্ত নিপুণ অভিনয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে 'সরি' বা দুঃখ প্রকাশ করতেন।

 

কিন্তু এই মিথ্যা ভদ্রতার আড়ালে তিনি গোপনে তার ক্যামেরায় ওই নারী ও নাবালিকাদের অপ্রস্তুত অবস্থার ভিডিও ধারণ করে নিতেন। এই জঘন্য অপরাধের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে গত ২ জুন। পশ্চিম দিল্লির রাজা গার্ডেন এলাকার এক বাসিন্দা পুলিশের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

 

অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, মোটরসাইকেলে আরোহী দুই অজ্ঞাত ব্যক্তি তার দুই নাবালিকা মেয়ের স্কুটিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। ধাক্কা দেওয়ার পর তারা ওই নাবালিকাদের পিছু নেয় এবং বিভিন্ন ধরনের আপত্তিকর ও অশালীন মন্তব্য করতে থাকে।

 

প্রথমদিকে এটিকে নিছক কোনো সড়ক দুর্ঘটনা বা বখাটেদের উৎপাত মনে হলেও, ঘটনার মোড় ঘোরে যখন ওই পিতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযুক্তের ফেসবুক পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেলে তার মেয়েদের হেনস্থা করার সেই গোপন ভিডিও আপলোড অবস্থায় দেখতে পান।

 

এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখার পরপরই তিনি আইনের আশ্রয় নেন এবং পুলিশকে বিস্তারিত অবহিত করেন। ভুক্তভোগীর অভিযোগ পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসে দিল্লি পুলিশ। প্রযুক্তির সহায়তায় এবং সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে গত শুক্রবার পশ্চিম দিল্লির সুভাষ নগর এলাকা থেকে অভিযুক্ত গুরমান সিংকে গ্রেপ্তার করা হয়।

 

পশ্চিম দিল্লির ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (ডিসিপি) হারেশ্বর স্বামী গণমাধ্যমকে জানান, অভিযুক্ত যুবকের পরিচালিত 'বাইকারঅনরোড৩৩' নামের ইউটিউব চ্যানেলটিতে প্রায় একুশ হাজার সাবস্ক্রাইবার বা নিয়মিত দর্শক রয়েছে।

 

এছাড়া ফেসবুকে তার একটি পেজ রয়েছে, যেখানে অনুসারীর সংখ্যা দুই লাখ দশ হাজারের বেশি। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, ওই ইউটিউব চ্যানেল এবং ফেসবুক পেজের সিংহভাগ ভিডিওতেই নারী এবং নাবালিকাদের অত্যন্ত অবমাননাকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

পুলিশের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত গুরমান সিং নিজের অপরাধের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত অনুসারী বা ফলোয়ার বাড়ানো, ভিডিওগুলোকে ভাইরাল করা এবং ইউটিউব ও ফেসবুক থেকে বিজ্ঞাপন বাবদ আয় বহুগুণ বৃদ্ধি করার হীন উদ্দেশ্যেই তিনি এই জঘন্য পথ বেছে নিয়েছিলেন।

 

তিনি অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে স্বীকার করেন যে, তার তৈরি করা ভিডিওগুলোতে দর্শকদের সম্পৃক্ততা বা এঙ্গেজমেন্ট বেশি নিশ্চিত করার জন্যই তিনি বিশেষভাবে নারী ও নাবালিকাদের লক্ষ্য করতেন। কারণ, নারীদের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির ভিডিওগুলো অনলাইনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বেশি দর্শক আকর্ষণ করে, যা তার আর্থিক আয়ের পথকে প্রশস্ত করে।

 

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ অত্যন্ত কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অপরাধ তদন্তের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে অভিযুক্তের মোবাইল ফোন এবং আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি জব্দ করা হয়েছে।

 

তার ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন বিতর্কিত কার্যক্রমের ভিডিও, আপত্তিকর স্ক্রিনশট এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণাদি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। অভিযুক্ত গুরমানের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আইনে একটি সুনির্দিষ্ট মামলা রুজু করা হয়েছে।

 

পাশাপাশি, তার ওই বিতর্কিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ও চ্যানেলগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও শুরু করেছে পুলিশ প্রশাসন। এই ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের নৈতিক সীমা এবং রাজপথে নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

 

- এনডিটিভি