শুক্রবার কলকাতার ঐতিহাসিক রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত ‘বন্দে মাতরম’-এর সার্ধশতবর্ষ বা দেড়শো বছর পূর্তি উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই তাৎপর্যপূর্ণ নীতিগত ঘোষণা দেন। তার এই বক্তব্য রাজ্য তথা সর্বভারতীয় রাজনীতিতে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, সরকারের এই পদক্ষেপগুলো কেবল কোনো সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়; বরং রাজ্যের আবহমান সামাজিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করার জন্য এগুলো আজ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের বর্তমান জনতাত্ত্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, রাজ্যের উন্মুক্ত ও ভৌগোলিকভাবে সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক সীমান্তগুলোকে ব্যবহার করে লাগাতার অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে।
এই অনিয়ন্ত্রিত ও বেআইনি অনুপ্রবেশের ফলে রাজ্যের জনসংখ্যার কাঠামোতে এক উদ্বেগজনক ও ভারসাম্যহীন পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ঘটনাগুলো।
তিনি জোরালো দাবি করেন, এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক কাঠামো, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সামগ্রিকভাবে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাজ্য সরকারের কঠোর, আপসহীন ও শূন্য সহনশীলতার নীতির কথা ব্যক্ত করে তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলেন, সরকার এই বিষয়ে অত্যন্ত তৎপর রয়েছে এবং অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বদ্ধপরিকর।
আইনি সংস্কার ও নতুন নীতি প্রণয়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যবাসীর কাছে কিছুটা সময় চেয়ে নেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি দেন যে, খুব শিগগিরই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ধর্মান্তরকরণ রোধে একটি অত্যন্ত কঠোর ও সময়োপযোগী আইন পাস করা হবে।
একই সঙ্গে রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এবং জাতীয় নাগরিক পঞ্জি পর্যায়ক্রমে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো মনে করছে, মুখ্যমন্ত্রীর এই উচ্চাভিলাষী ঘোষণা রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক, আইনি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সুদূরপ্রসারী ও ব্যাপক মাত্রায় প্রভাব ফেলবে।
সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্ছিদ্র করা এবং অবৈধ অভিবাসীদের নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করার বিষয়ে রাজ্য সরকারের ইতিমধ্যে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে তিনি জানান যে, বর্তমান প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্ব ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছে।
রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে সীমান্ত এলাকায় আধুনিক ও কার্যকর নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি, যারা অবৈধভাবে আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে রাজ্যে প্রবেশ করেছে, তাদের যথাযথভাবে চিহ্নিত করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় নিজ দেশে বিতাড়িত করার উদ্দেশ্যে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বিশেষ আটক কেন্দ্র স্থাপন করার কাজ এগিয়ে চলেছে।
যারা বেআইনিভাবে ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশ করছে এবং দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ বিভিন্ন বেআইনি কার্যকলাপে লিপ্ত হচ্ছে, তাদের কোনোভাবেই বিন্দুমাত্র আইনি বা প্রশাসনিক ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
নাগরিকত্ব প্রদান এবং অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে আইনি ও নৈতিক দিক থেকে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য রেখা টেনে মুখ্যমন্ত্রী বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের প্রসঙ্গটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তার ভাষণে তুলে ধরেন।
তিনি স্পষ্ট করেন যে, প্রতিবেশী দেশগুলোতে যারা চরম ধর্মীয় নিপীড়ন, বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে নিজেদের জীবন ও সম্মান বাঁচাতে বাধ্য হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, বিশেষ করে সেই হিন্দু শরণার্থীরা, তাদের কোনো বিচারেই 'অনুপ্রবেশকারী' হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।
বরং এই আইনের নির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই অসহায় শরণার্থীদের বৈধ নাগরিকত্ব প্রদান করে তাদের একটি সম্মানজনক ও নিরাপদ জীবনযাপনের অধিকার রাষ্ট্র পুরোপুরি নিশ্চিত করবে।
বক্তব্যের একেবারে শেষাংশে তিনি রাজ্যের অভ্যন্তরে বসবাসকারী একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিকতা ও কার্যকলাপের তীব্র এবং কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যারা এই স্বাধীন দেশের মাটিতে বসবাস করে রাষ্ট্রের প্রদত্ত সমস্ত সুযোগ-সুবিধা অবলীলায় ভোগ করছেন, অথচ দেশের অকুতোভয় প্রতিরক্ষাবাহিনীর প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান প্রদর্শন করতে কুণ্ঠাবোধ করেন, তাদের এই দ্বৈত আচরণ স্বাধীন রাষ্ট্রে আর সহ্য করা হবে না।
তিনি সুনির্দিষ্টভাবে 'অপারেশন সিঁদুর'-এর মতো জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট পদক্ষেপের বিরোধিতাকারী এবং 'পেহেলগাম' ইস্যুতে রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ থাকা ব্যক্তিদের তীব্র ভর্ৎসনা করেন।
যারা কেবল নিজেদের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সুবিধার্থে মানবাধিকার ও মানবতার ফাঁকা বুলি আওড়ান কিন্তু বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কাজে লিপ্ত থাকেন, রাজ্যে তাদের এ ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ আর কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না বলে তিনি তার বক্তব্যে অত্যন্ত জোরালো ও দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করেন।