বৃহস্পতিবার, জুন ২৫, ২০২৬
১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনীকে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করার ঘোষণা কিমের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুন, ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম

উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনীকে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করার ঘোষণা কিমের
ছবি : Collected

কোরীয় উপদ্বীপ এবং সংলগ্ন এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা যোগ করে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন তার দেশের নৌবাহিনীকে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করার এক যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন।

 

একই সঙ্গে, দেশটির নৌবাহিনীর সামরিক সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী দিনগুলোতে ১০ হাজার টন ওজনের অত্যাধুনিক এবং নতুন প্রজন্মের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের একটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী রূপরেখাও তিনি দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছেন।

 

আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, পিয়ংইয়ংয়ের এই সময়োপযোগী ও কৌশলগত পদক্ষেপ অত্র অঞ্চলে বিরাজমান সামরিক ভারসাম্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬ তারিখে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ) কর্তৃক প্রকাশিত এক বিশেষ সংবাদ প্রতিবেদনে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

উক্ত প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে জানানো হয় যে, দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নামপো বন্দর নগরীতে ‘চোয়ে হিয়ন’ নামক ৫ হাজার টন শ্রেণির একটি নতুন ও শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজের আনুষ্ঠানিক কমিশনিং বা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন এই যুগান্তকারী ঘোষণা প্রদান করেন।

 

বিশাল সামরিক আবহে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও নৌ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন, যেখানে কিম তার দেশের নৌ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বমানে উন্নীত করার এবং নতুন যুগে প্রবেশ করানোর দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদানকালে কিম জং উন অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনীকে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করার যে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি রাষ্ট্র গ্রহণ করেছে, তা পূর্বনির্ধারিত ছক ও পরিকল্পনা অনুযায়ী অত্যন্ত নির্ভুল এবং নিখুঁতভাবে সামনের দিকে এগিয়ে চলছে।

 

এই যুগান্তকারী উদ্যোগকে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী কৌশলগত পদক্ষেপ। এই দূরদর্শী পদক্ষেপের মাধ্যমে রাষ্ট্রের পারমাণবিক শক্তিকে কেবল স্থলেই সীমাবদ্ধ না রেখে, বরং জলভাগেও বহুমুখী ও কার্যকর সামরিক অভিযানের জন্য সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুত রাখতে সক্ষম হবে পিয়ংইয়ং।

 

এর ফলে শত্রুপক্ষের যেকোনো ধরনের আকস্মিক হুমকি মোকাবিলায় উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনী ভবিষ্যতে একটি অজেয় ও অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।

 

এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, উত্তর কোরিয়া এর আগেই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেছিল যে, সদ্য কমিশনিং করা ‘চোয়ে হিয়ন’ যুদ্ধজাহাজটি তাদের হাতে থাকা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভয়ংকর, অত্যাধুনিক ও শক্তিশালী অস্ত্রে সজ্জিত করা হয়েছে।

 

শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে, এর বাস্তব কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য গত এপ্রিল মাসে কিম জং উন স্বয়ং সশরীরে উপস্থিত থেকে এই যুদ্ধজাহাজটি থেকে একটি অত্যাধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সরাসরি তদারকি করেছিলেন।

 

সেই সফল সামরিক পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া মূলত সমগ্র বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই প্রচ্ছন্ন বার্তাই দিতে চেয়েছিল যে, তাদের নৌবাহিনী এখন দূরপাল্লার এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম এমন মারণাস্ত্র পরিচালনায় সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে।

 

নৌবাহিনীর আধুনিকায়নের এই চলমান ধারাবাহিকতায় কিম জং উন তার সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, ‘চোয়ে হিয়ন’-এর সফল অভিষেকের পরপরই খুব শিগগিরই ‘কাং কোন’ নামের আরেকটি অত্যাধুনিক সামরিক ডেস্ট্রয়ারকে নৌবাহিনীর নিয়মিত কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত করা হবে।

 

শুধু তাই নয়, এরপর পর্যায়ক্রমে এবং ধাপে ধাপে ১০ হাজার টন শ্রেণির কৌশলগত যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ ও মোতায়েন করার এক বিশাল সামরিক কর্মযজ্ঞ দেশটিতে শুরু হতে যাচ্ছে।

 

কিম আরও সুনির্দিষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, উত্তর কোরিয়া এখন থেকে প্রতি বছর ‘চোয়ে হিয়ন’-এর চেয়েও বহুগুণ উন্নত ও শক্তিশালী শ্রেণির অন্তত পক্ষে দুটি নতুন যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে অন্যতম মূল আকর্ষণ হিসেবে থাকবে একটি ১০ হাজার টনের সুবিশাল ক্রুজার।

 

সামরিক পরিভাষায় ও আন্তর্জাতিক সমরাস্ত্রের মানদণ্ডে ১০ হাজার টন শ্রেণির একটি যুদ্ধজাহাজের আকার, ধ্বংসক্ষমতা এবং সামরিক উপযোগিতা প্রায় কল্পনাতীত। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মানদণ্ডে এই বিশাল আকারের যুদ্ধজাহাজগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বিশ্বখ্যাত ‘আর্লেই বার্ক’ শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার কিংবা প্রতিবেশী রাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবহরে থাকা ‘সেজং দ্য গ্রেট’ শ্রেণির অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজের একেবারেই সমপর্যায়ের বলে বিবেচনা করা হয়।

 

প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কাঠামোগত দিক থেকে বিচার করলে, এসব বিশালাকৃতির যুদ্ধজাহাজ সাধারণত ১৫০ থেকে ১৭০ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে থাকে এবং এগুলোর সর্বমোট ওজন কয়েক হাজার সাধারণ মোটরগাড়ির সম্মিলিত ওজনের সমান হয়।

 

বর্তমানে কোরীয় উপদ্বীপ এবং এর আশপাশের জলসীমায় নৌবাহিনীর শক্তিমত্তার তুলনামূলক চিত্র গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সামরিক প্রযুক্তি এবং যুদ্ধজাহাজের আকারের দিক থেকে দক্ষিণ কোরিয়া এখনও পর্যন্ত অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

 

বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর সক্রিয় বহরে ৫ হাজার টনের বেশি ওজনের অন্তত দশটিরও বেশি শক্তিশালী ও আধুনিক যুদ্ধজাহাজ সার্বক্ষণিকভাবে মোতায়েন রয়েছে। এর বিপরীতে উত্তর কোরিয়ার হাতে এই সমকক্ষ ও সমমানের যুদ্ধজাহাজ রয়েছে মাত্র দুটি।

 

নৌ শক্তির এই বিশাল দৃশ্যমান ব্যবধান দ্রুত কমিয়ে আনা এবং আঞ্চলিক জলসীমায় নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যেই কিম জং উন তার দেশকে এই নতুন সামরিক ও পারমাণবিক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ করেছেন, যা সমগ্র বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

 

জিও নিউজ