তবে আন্তর্জাতিক মহলে বহুল প্রতীক্ষিত এই আলোচনার প্রেক্ষাপটে একটি বিষয় অত্যন্ত সুস্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই মুহূর্তেই ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের আন্তর্জাতিক ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়া হচ্ছে না।
পাকিস্তানের বর্তমান উপপ্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম আল-আরাবিয়াকে দেওয়া এক বিশেষ ও একান্ত সাক্ষাৎকারে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।
তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, দশকের পর দশক ধরে চলে আসা জটিলতা নিরসনে কোনো তাড়াহুড়ো নয়, বরং অত্যন্ত সতর্ক, বাস্তবসম্মত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে উভয় পক্ষ।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় পুরো বিশ্ব নজর রাখছে এই সমঝোতা প্রক্রিয়ার দিকে। এই দুই চিরবৈরী রাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই ঐতিহাসিক আলোচনার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ বা ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’।
এই চুক্তির সুনির্দিষ্ট রূপরেখা অনুযায়ী পরবর্তী ধাপের কূটনৈতিক আলোচনা ও দরকষাকষি মূলত তিনটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে।
প্রথমত, ইরানের ওপর দীর্ঘকাল ধরে আরোপিত পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞাগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ এবং তা শিথিল করার সম্ভাব্য উপায় খোঁজা।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরম বিতর্কের জন্ম দেওয়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং পারমাণবিক বিস্তার রোধে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি।
এবং তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত উদ্বেগজনক লেবানন পরিস্থিতির একটি টেকসই, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য উত্তরণ। এই তিনটি জটিল ও বহুমাত্রিক বিষয় অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিখুঁতভাবে পর্যালোচনার জন্য উভয় দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে তিনটি পৃথক কারিগরি দল গঠন করা হয়েছে, যারা ইতিমধ্যে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও পেশাদারির সঙ্গে নিবিড়ভাবে নিজেদের কাজ শুরু করেছেন।
এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও যুগান্তকারী সমঝোতা প্রক্রিয়াকে একটি স্থায়ী, কাঠামোগত ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য আইনি রূপ দিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য প্রাথমিকভাবে ৬০ দিনের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ধারাবাহিক ও গভীর আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত, বাস্তবসম্মত ও ফলপ্রসূ চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে উভয় পক্ষই অত্যন্ত আন্তরিক ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তবে আলোচনার কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি ও কৌশলগত প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে এবং উভয় পক্ষের পারস্পরিক ও লিখিত সম্মতিতে প্রয়োজনে এই সময়সীমা আরও বাড়ানো যেতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সাতচল্লিশ বছর পর এই প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যে একই টেবিলে সরাসরি ও সামনাসামনি আলোচনায় বসতে সক্ষম হয়েছে, তা বৈশ্বিক কূটনীতির ইতিহাসে একটি বিরল ও অভাবনীয় ঘটনা।
আর এই অসাধ্য সাধনের নেপথ্যে পাকিস্তানের দীর্ঘমেয়াদি, নিরবচ্ছিন্ন ও অত্যন্ত পরিপক্ব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। ইসহাক দার অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিশ্চিত করেছেন যে, এখানে পর্দার আড়ালে কোনো গোপন বা অলিখিত সমঝোতা হয়নি, বরং সম্পূর্ণ লিখিত ও আইনি ভিত্তি সম্পন্ন ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’র মাধ্যমেই এই অত্যন্ত জটিল কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক মজুত পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য স্পর্শকাতর বিষয়েও দ্রুত ইতিবাচক অগ্রগতি আসার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নই নয়, বরং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য এবং সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি বৃহত্তর ও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর এবং তুরস্ক একত্রে মিলে ‘আর-৪ ফোরাম’ নামক একটি সম্পূর্ণ নতুন ও অত্যন্ত শক্তিশালী আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করেছে।
এটি কেবল প্রথাগত কোনো রাজনৈতিক জোট নয়, বরং এটি প্রায় পঞ্চাশ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্বকারী একটি বিশাল ও যৌথ অর্থনৈতিক মঞ্চ। এই শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মটি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর, ভূমধ্যসাগর এবং বিস্তীর্ণ আফ্রিকা মহাদেশকে এক সুতোয় সংযুক্ত করবে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের মতে, পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইরান উভয়েই এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকটিকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে।
এই যুগান্তকারী চুক্তি ও নবগঠিত জোট আগামী দিনে বিশ্বজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার দীর্ঘস্থায়ী সংকট নিরসনে একটি সুপরিকল্পিত, কার্যকর ও শক্তিশালী কাঠামো হিসেবে কাজ করবে বলে আন্তর্জাতিক মহল গভীরভাবে বিশ্বাস করে।