মঙ্গলবার, জুন ২৩, ২০২৬
৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির আবহে রাষ্ট্রীয় সফরে পাকিস্তানে ইরানের প্রেসিডেন্ট

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ জুন, ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির আবহে রাষ্ট্রীয় সফরে পাকিস্তানে ইরানের প্রেসিডেন্ট
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করে এক দিনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে পাকিস্তানে পৌঁছেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। মঙ্গলবার পাকিস্তানের ঐতিহাসিক নূর খান বিমানঘাঁটিতে তিনি অবতরণ করেন।

 

সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান স্বাগতিক দেশের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং বর্তমান সরকারের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।

 

পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এই আগমনের খবর অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্প্রচার করেছে। একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, জটিল ও তাৎপর্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আবহে এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক রূপরেখা নির্ধারণে অত্যন্ত গভীর ভূমিকা পালন করবে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা গভীরভাবে মনে করছেন।

 

ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের এই ঝটিকা সফরের সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয় দিক হলো এর সময়কাল এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের মধ্যে অত্যন্ত গোপনীয়, নিবিড় ও ঐতিহাসিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

 

সেই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত বৈরিতা ও উত্তেজনা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে দুই দেশ আগামী ষাট দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বা রূপরেখায় আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মত হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই যুগান্তকারী সমঝোতা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ও অন্যতম প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পাকিস্তানের একটি অত্যন্ত নীরব কিন্তু কৌশলগত ভূমিকা রয়েছে।

 

ধারণা করা হচ্ছে, এই সফরের মূল আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ইরানের এই সাম্প্রতিক সমঝোতার ইতিবাচক অগ্রগতি এবং এর সফল বাস্তবায়নের নানাবিধ দিক দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

 

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এর আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল যে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বিশেষ আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েই ইরানের প্রেসিডেন্ট এই রাষ্ট্রীয় সফর করছেন।

 

এই সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত নিবিড় সফরে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও মজবুত করার পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বিশদ আলোচনা হবে।

 

বিশেষ করে, দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক বাণিজ্যের ব্যাপক সম্প্রসারণ, জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকট নিরসন ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘ ও অরক্ষিত সীমান্তের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা, আন্তঃদেশীয় সাধারণ জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ও গঠনমূলক সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক সংযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এই সফরের আলোচনায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।

 

বিশেষ করে সীমান্ত অঞ্চলে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা সন্ত্রাসবাদ দমন এবং চোরাচালান রোধে উভয় দেশের সামরিক ও বেসামরিক যৌথ উদ্যোগের বিষয়টি নতুন করে গতিশীলতা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

সফরকালে অত্যন্ত ব্যস্ত ও সময়সূচিবদ্ধ সময় পার করবেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার ও পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী তিনি প্রথমেই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির সঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একান্ত বৈঠক করবেন।

 

এরপর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও প্রতিনিধি পর্যায়ের বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এসব শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের বাইরেও পাকিস্তানের বর্তমান উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার, পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটের চেয়ারম্যান এবং নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদের স্পিকারও প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বিশেষ সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।

 

দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের এই ধারাবাহিক ও উন্মুক্ত আলোচনা মূলত পারস্পরিক আস্থার ঐতিহাসিক ভিত্তি আরও মজবুত করার একটি বলিষ্ঠ ও যুগান্তকারী কূটনৈতিক প্রয়াস হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

 

এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বিশেষ করে বহুল আলোচিত পাক-ইরান গ্যাস সঞ্চালন লাইন স্থাপনের মতো বিষয়গুলোও নতুন করে আলোর মুখ দেখতে পারে বলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদরা জোরালো আশা প্রকাশ করছেন।

 

একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের রাষ্ট্রক্ষমতায় আনুষ্ঠানিকভাবে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট হিসেবে মাসউদ পেজেশকিয়ানের এটি দ্বিতীয় পাকিস্তান সফর।

 

এত অল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো প্রতিবেশী এই রাষ্ট্রে তার আনুষ্ঠানিক পদার্পণ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, তেহরান তার বর্তমান বৈদেশিক নীতিতে প্রতিবেশীদের কতটা কৌশলগত গুরুত্ব দিচ্ছে।

 

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রবল চাপ সামলে নিজেদের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা এবং একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের রাজনৈতিক বলয় ও প্রভাব সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের মতো একটি পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম দেশের পূর্ণ ও শর্তহীন সমর্থন ইরানের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

 

অন্যদিকে, চরম অর্থনৈতিক সংকট ও তীব্র জ্বালানি ঘাটতিতে ভোগা পাকিস্তানের জন্যও প্রতিবেশী দেশ ইরানের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ও মসৃণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা বর্তমান জাতীয় স্বার্থেই অপরিহার্য।

 

ফলে, দুই দেশের এই উচ্চ পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফর কেবল প্রথাগত আনুষ্ঠানিক কূটনীতির অংশ নয়, বরং পরিবর্তিত ও মেরুকরণ হওয়া বিশ্ব পরিস্থিতিতে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করার এক অনন্য কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।