ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই বিশেষ আমন্ত্রণপত্রটি নয়াদিল্লির কাছে হস্তান্তর করেছেন। তবে আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় শোক অনুষ্ঠানে ভারতের পক্ষ থেকে কে সরাসরি প্রতিনিধিত্ব করবেন তার দিকে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং উপস্থিত থাকবেন নাকি অন্য কোনো উচ্চপদস্থ মন্ত্রীকে পাঠানো হবে, সে বিষয়ে নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি।
স্বনামধন্য ভারতীয় সংবাদমাধ্যম উইয়ন নিউজের এক বিস্তারিত ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এই উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আমন্ত্রণের বিষয়টি সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি ও ভূকৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে ভারত সব সময়ই ইরানকে তার বিস্তৃত প্রতিবেশী অঞ্চলের একটি অবিচ্ছেদ্য ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই দুই প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে অর্থনৈতিক বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের পুরোনো এবং ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত সুদৃঢ়।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিম এশিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে চলমান ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার পালাবদল এবং টানা চল্লিশ দিনের ধ্বংসাত্মক ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলাকালে এই দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংকটকালীন সেই কঠিন ও উত্তেজনাকর সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর একাধিকবার ইরানের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে গভীর ও ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর স্বার্থে উভয় দেশই নিজেদের মধ্যে এই কূটনৈতিক সংযোগ ও বোঝাপড়া নিরবচ্ছিন্ন রাখার ওপর বরাবরের মতোই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করেছে।
চলমান সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় সদ্য কার্যকর হওয়া একটি অত্যন্ত নাজুক ও সংবেদনশীল যুদ্ধবিরতির মধ্যেই দেশ দুটির কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সম্প্রতি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত বিকাশমান অর্থনীতির উদীয়মান দেশগুলোর জোট ব্রিকস-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সম্মেলনে অংশ নিতে ভারত সফর করেছেন ইরানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বহুল আলোচিত সফরকালে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দীর্ঘ, রুদ্ধদ্বার ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক সম্পন্ন করেন। শুধু পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়েই নয়, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও এক বিশেষ ও আন্তরিক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্রিকস জোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও কর্মকর্তাদের এই ধারাবাহিক ভারত সফর দুই দেশের ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, কৌশলগত স্বার্থ এবং গভীর আস্থারই এক সুস্পষ্ট ও ইতিবাচক প্রতিফলন।
ঘটনার পেছনের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাবিধুর ও স্পর্শকাতর। উল্লেখ্য যে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সমীকরণকে রাতারাতি পুরোপুরি বদলে দেওয়া এক আকস্মিক ও ভয়াবহ বিমান হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক বাহিনীর চালানো ওই নির্দিষ্ট ও সুপরিকল্পিত হামলায় তার করুণ মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনা সমগ্র মুসলিম বিশ্বসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ইরানে দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রীয় শোকের ছায়া নেমে আসে।
একজন দীর্ঘকালীন, প্রভাবশালী ও অবিসংবাদিত রাষ্ট্রনায়কের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মহল থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্র এবং দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মিত্র হিসেবে ভারত সরকারও এই দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে।
সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পরপরই ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি হিসেবে দেশটির জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ও পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিসরি নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাসে সশরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানে তিনি রক্ষিত বিশেষ শোকবইয়ে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে ভারতের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গভীর শ্রদ্ধা ও সমবেদনা নিবেদন করেছিলেন।
বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে খামেনির বিদায় এবং নতুন নেতৃত্বের উত্থানের এই সন্ধিক্ষণে ভারতের মতো একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক পরাশক্তির উপস্থিতি ইরান অত্যন্ত গভীরভাবে প্রত্যাশা করছে। ইরানের এই আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ কেবল একটি প্রথাগত কূটনৈতিক শিষ্টাচার নয়, বরং এটি বৈরী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে মিত্রদের পাশে পাওয়ার একটি সুস্পষ্ট বার্তাও বটে।
ভারতের জন্য এই আমন্ত্রণ একই সঙ্গে সম্মানজনক এবং কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত গভীর।
অন্যদিকে, জ্বালানি সরবরাহ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও নয়াদিল্লির জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই রাষ্ট্রীয় শোক অনুষ্ঠানে ভারতের অংশগ্রহণের মাত্রা ও ধরন আগামী দিনগুলোতে দেশ দুটির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।