দল থেকে বেরিয়ে যাওয়া একদল প্রভাবশালী বিদ্রোহী নেতা সমান্তরালভাবে নতুন নেতৃত্ব ও কমিটি ঘোষণা করার পর থেকেই মূলত প্রতীকের মালিকানা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন ও নানামুখী সমীকরণ শুরু হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনের আদলে এই সংকটকে তৃণমূলের ইতিহাসের অন্যতম বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ এই কোন্দল চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে গত সোমবার।
দলটির ক্ষুব্ধ ও বিদ্রোহী নেতারা এক বিশেষ বৈঠকের মাধ্যমে সর্বময় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের চেয়ারপারসন এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অপসারণের একতরফা ঘোষণা দেন।
একই সঙ্গে তারা দলের একটি বিকল্প পরিচালনা কমিটি গঠন করে হাওড়া মধ্য বিধানসভা কেন্দ্রের প্রবীণ বিধায়ক ও রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ রায়কে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করেন। এছাড়া ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়সহ আরও তিন প্রভাবশালী নেতাকে এই নতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিদ্রোহী শিবিরের এমন আকস্মিক ও বড় ধরনের পদক্ষেপের পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে মূল প্রশ্নটি সামনে এসেছে যে, এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী কি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়ে তৃণমূলের মূল প্রতীক ‘জোড়া ঘাসফুল’ এর আইনি নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করবে? অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত মমতাপন্থী শীর্ষ নেতৃত্ব এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
তারা দলবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে এই বিদ্রোহী আট নেতাকে সরাসরি ‘বেইমান’ ও ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। দল থেকে কেন তাদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না, তা জানতে চেয়ে ইতিমধ্যেই অনুগত নেতৃত্বের পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
তবে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল এই ধরনের সাময়িক সাংগঠনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে শেষ রক্ষা করা বা দলীয় প্রতীক বাঁচানো তৃণমূলের জন্য বেশ কঠিন হতে পারে।
কারণ, বিদ্রোহী গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই ভারতের নির্বাচন কমিশনের কাছে তাদের নতুন কমিটির সমস্ত নথিপত্র ও তথ্য জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। এর ফলে জোড়া ঘাসফুলের প্রকৃত মালিকানা কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণের জন্য একটি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে।
তৃণমূলের এই গভীর সংকট কেবল রাজ্য বিধানসভা বা স্থানীয় স্তরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে দিল্লির লোকসভার তৃণমূল সাংসদদের মধ্যেও। জানা গেছে, লোকসভার বেশ কয়েকজন অসন্তুষ্ট ও বিদ্রোহী সাংসদ ইতিমধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেস ত্যাগ করে ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া’ বা এনসিপিআই নামক অন্য একটি রাজনৈতিক দলে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেছেন।
তবে নতুন দলে যোগ দিলেও তারা তৃণমূলের ঐতিহ্যবাহী এবং সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই প্রতীকের ওপর থেকে নিজেদের দাবি ছাড়তে নারাজ। এই ধারাবাহিকতায় গত ১৮ জুন তৃণমূলের তারকা সাংসদ ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী শতাব্দী রায়ের বাসভবনে ক্ষুব্ধ নেতাদের একটি বিশেষ ও গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সেই বৈঠকে নির্বাচন কমিশন এবং আদালতে কীভাবে প্রতীকের অধিকারের পক্ষে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত কৌশলগত আলোচনা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯৮ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে আত্মপ্রকাশ করেছিল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীকটি পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত সুপরিচিত এবং আবেগের একটি বিষয়ে পরিণত হয়।
দলের মূল গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এই প্রতীকটি সাধারণ মেহনতি মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ, তৃণমূল পর্যায়ের লড়াকু রাজনীতি এবং গভীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে এই প্রতীকের মূল নকশা বা ডিজাইন নিয়ে অতীতেও রাজনৈতিক ও শৈল্পিক অঙ্গনে বেশ বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী সোমনাথ চৌধুরী বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন যে, তিনিই মূলত এই নান্দনিক প্রতীকের মূল রূপকার বা ডিজাইনার। অন্যদিকে, তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই নিজেকে এই জোড়া ঘাসফুলের একমাত্র স্রষ্টা হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন।
বর্তমান রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের এই অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক সংকট যদি আগামী দিনগুলোতে আরও গভীর ও ঘনীভূত হয়, তবে তা কেবল দলটির নেতৃত্বের পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
বরং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে জোড়া ঘাসফুলের মতো একটি ঐতিহাসিক ও প্রভাবশালী প্রতীক নিয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশন এবং উচ্চ আদালতে এক দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল আইনি লড়াইয়ের সূচনা হতে পারে, যা দলটির অস্তিত্বের সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।