গত মঙ্গলবার রাতে মুম্বাইয়ের চার্চগেট স্টেশন থেকে নাল্লাসোপারাগামী একটি দ্রুতগামী লোকাল ট্রেনের ভেতর এক যাত্রীকে জনসমক্ষে ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। নিহত ওই হতভাগ্য যুবকের নাম ময়ঙ্ক লোহার। তিনি ট্রেনটির প্রথম শ্রেণির কামরায় ভ্রমণ করছিলেন।
অত্যন্ত সুরক্ষিত বলে বিবেচিত প্রথম শ্রেণির কামরার ভেতরে এমন অপ্রত্যাশিত ও ভয়ানক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি শুধু নিত্যযাত্রীদেরই নয়, বরং পুরো ভারতের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য, নিরাপত্তাহীনতা ও গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির বিস্তারিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন রাতে মুম্বাই শহরের ওপর দিয়ে প্রবল বৃষ্টিপাত বয়ে যাচ্ছিল। দুর্যোগপূর্ণ এই আবহাওয়ার মধ্যে ট্রেনটি যখন তার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে গিয়ে গোরেগাঁও এবং কান্দিভালি স্টেশনের মাঝামাঝি একটি এলাকায় পৌঁছায়, ঠিক তখনই প্রথম শ্রেণির কামরার ভেতরে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও মারাত্মক বিতণ্ডার সূত্রপাত ঘটে।
প্রবল বৃষ্টির কারণে ছাঁট আসা পানি কামরার ভেতরে যেন প্রবেশ করে যাত্রীদের ভিজিয়ে দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য এক যাত্রী ট্রেনের দরজাটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে নিজের জোরালো অবস্থান ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে, নিহত ময়ঙ্ক লোহার বা তার পক্ষের কোনো যাত্রী বাইরের বাতাস চলাচলের সুবিধার্থে দরজাটি খোলা রাখতে চেয়েছিলেন। অত্যন্ত সাধারণ ও প্রাত্যহিক এই মতপার্থক্যটি মুহূর্তের মধ্যেই দুই পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনায় রূপ নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, দরজা খোলা ও বন্ধ রাখার এই সাধারণ বাদানুবাদ একপর্যায়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ছাড়িয়ে সরাসরি হাতাহাতি ও চরম সংঘাতে গড়ায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তি হঠাৎ ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের সঙ্গে থাকা ব্যাগ থেকে একটি অত্যন্ত ধারালো ছুরি বের করে আনেন এবং ময়ঙ্ক লোহারের ওপর অতর্কিত ও প্রাণঘাতী হামলা চালান।
ধারালো ছুরির উপর্যুপরি আঘাতে ময়ঙ্ক লোহার বুক ও পেটে মারাত্মকভাবে জখম হন এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে চলন্ত ট্রেনের কামরার ভেতরেই সবার চোখের সামনে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের একটি ভিডিও চিত্র এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেখে শিউরে উঠেছেন নেটিজেনরা। কামরার ভেতরে থাকা এক আতঙ্কগ্রস্ত যাত্রীর মুঠোফোনে ধারণ করা ওই ভিডিওটিতে দেখা যায়, সম্পূর্ণ কালো পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি হাতে একটি রক্তমাখা ছুরি নিয়ে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও উন্মত্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন।
ঠিক তার পাশেই একজন রক্তাক্ত অবস্থায় ট্রেনের মেঝেতে নিথর হয়ে পড়ে আছেন। এ সময় পুরো কামরায় চরম বিভীষিকাময় এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওটিতে স্পষ্টভাবে যাত্রীদের অত্যন্ত ভীত ও আতঙ্কগ্রস্ত কণ্ঠে বারবার বলতে শোনা যায় যে, "লোকটি তাকে মেরেই ফেলেছে।"
প্রাণভয়ে সাধারণ যাত্রীরা ওই সশস্ত্র হামলাকারীর কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন, যা পুরো দৃশ্যটিকে আরও বেশি হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক করে তোলে। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই মুম্বাইয়ের বোরিভালি রেলওয়ে থানার পুলিশ অতি দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় এবং পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।
রেলওয়ে পুলিশের জ্যেষ্ঠ পরিদর্শক দত্তা খুপ্রেকার উপস্থিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাছে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রাথমিক বিবরণ নিশ্চিত করেছেন। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপ ও হতাশার সঙ্গে জানান যে, কেবল বৃষ্টির কারণে ট্রেনের দরজা বন্ধ করা নিয়ে শুরু হওয়া একটি নিতান্তই তুচ্ছ ও সাধারণ তর্ক শেষ পর্যন্ত এমন একটি মর্মান্তিক, রক্তক্ষয়ী ও প্রাণঘাতী ঘটনায় পর্যবসিত হলো, যা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জানা গেছে, ঘটনার সময় দরজা নিয়ে বিতণ্ডার একপর্যায়ে কামরায় উপস্থিত আরও কয়েকজন ক্ষুব্ধ যাত্রী অভিযুক্ত ওই ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে মারধর করেছিলেন।
এই সম্মিলিত মারধরের শিকার হয়েই ওই ব্যক্তি চরমভাবে অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং পুরোপুরি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে নিজের ব্যাগ থেকে ছুরি বের করে এই মারাত্মক হামলাটি চালান। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পরপরই ওই হামলাকারী অত্যন্ত সুকৌশলে ভিড়ের সুযোগ নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
পুলিশ এরই মধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার ভিত্তিতে ওই পলাতক অভিযুক্তকে রোশন সুভার্না হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করেছে। রেলওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে নিহত ময়ঙ্ক লোহারের মৃতদেহটি উদ্ধার করে আনুষ্ঠানিক ময়নাতদন্তের জন্য নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পলাতক ঘাতক রোশন সুভার্নাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের একাধিক চৌকস ও বিশেষায়িত দল গঠন করা হয়েছে। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত ও সম্ভাব্য সব গোপন আস্তানায় তাকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে পুলিশের চিরুনি অভিযান বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে।