একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছর ধরে প্রতি বছর দুটি করে নতুন যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে পিয়ংইয়ং। এর প্রতিটি যুদ্ধজাহাজের ওজন হবে পাঁচ হাজার টন। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার এই পদক্ষেপ কোরীয় উপদ্বীপ এবং এর আশপাশের অঞ্চলের নিরাপত্তায় এক নতুন মাত্রার উদ্বেগ তৈরি করবে।
শুধু জাহাজ নির্মাণেই সীমাবদ্ধ না থেকে দেশটির নৌবাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করার এক যুগান্তকারী পরিকল্পনার কথাও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন উত্তর কোরীয় নেতা। গত মঙ্গলবার উত্তর কোরিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী নাম্পোতে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ সামরিক অনুষ্ঠানে দেশের নৌবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির এই চিত্রটি আরও একবার উন্মোচিত হয়।
এদিন ‘চো হিয়ন’ নামের একটি পাঁচ হাজার টনের শক্তিশালী ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজকে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবাহিনীর বহরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই কমিশনিং বা অন্তর্ভুক্তি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন কিম জং উন। তাঁর উপস্থিতি এবং দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য এই প্রকল্পের প্রতি উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গুরুত্বকে জোরালোভাবে প্রমাণ করে।
অনুষ্ঠানে দেওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক ভাষণে সর্বোচ্চ নেতা বলেন, অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পাঁচ হাজার টনের ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ চো হিয়নকে নৌবাহিনীতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় খুব শিগগিরই ‘ক্যাং কন’ নামের আরও একটি উন্নত ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ নৌবাহিনীর বহরে কমিশন করা হবে।
ক্যাং কন নামের সেই যুদ্ধজাহাজটিও হবে পাঁচ হাজার টনের এবং সেটি যেকোনো ধরনের সামরিক ও নৌ অপারেশনে ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণ উপযোগী করে তৈরি করা হচ্ছে। কিম জং উন তাঁর বক্তব্যে দেশের ভবিষ্যৎ সামরিক ও নৌ প্রতিরক্ষা খাতের রূপরেখা তুলে ধরে বলেন, এখন থেকে পিয়ংইয়ং প্রতি বছর অন্তত দুটি করে নতুন যুদ্ধজাহাজ তৈরি করবে।
আগামী পাঁচ বছর পর্যন্ত এই নিবিড় ও ধারাবাহিক প্রকল্প চলমান থাকবে। এই মহাপরিকল্পনার আওতাতেই একটি দশ হাজার টনের সুবিশাল ক্রুজার যুদ্ধজাহাজও তৈরি করা হবে, যা নৌবাহিনীর আভিযানিক সক্ষমতাকে এক অকল্পনীয় উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
আধুনিক বিশ্বে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং শত্রুদের যেকোনো আক্রমণ প্রতিহত করতে দেশের নৌবাহিনীকে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করার পরিকল্পনাও সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উত্তর কোরিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যম কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ) এই যুদ্ধজাহাজ অন্তর্ভুক্তি নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংবাদমাধ্যমটির তথ্য অনুযায়ী, চো হিয়ন নামক যুদ্ধজাহাজটিকে চূড়ান্তভাবে কমিশন করার আগে টানা চৌদ্দ মাস ধরে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করেছে উত্তর কোরীয় নৌবাহিনী।
দীর্ঘ এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জাহাজটির প্রতিটি প্রযুক্তিগত ও সামরিক সক্ষমতা নিখুঁতভাবে যাচাই করা হয়েছে। কেসিএনএর পূর্ববর্তী এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, চো হিউন ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজটিতে উত্তর কোরীয় নৌবাহিনীর ভাণ্ডারে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্রগুলো সফলভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে।
এমনকি গত এপ্রিল মাসে এই জাহাজটি থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে অত্যাধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল, যা এর আক্রমণাত্মক সক্ষমতার চূড়ান্ত প্রমাণ বহন করে। ভবিষ্যতে দেশের নৌ প্রতিরক্ষা খাতকে আরও উন্নত, আধুনিক ও সমৃদ্ধ করার বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে মঙ্গলবারের ভাষণে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রসঙ্গটিও টেনে আনেন।
তিনি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কড়া সমালোচনা করে বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাদের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই অঞ্চলটিকে একটি ভয়াবহ পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।
তাদের এই ক্রমাগত আগ্রাসী মনোভাব ও সামরিক মহড়ার কারণে জাতীয় নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে। তাই নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং এমন বৈরী পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ তাদের সামনে খোলা নেই।
এই কারণেই নৌবাহিনীকে একটি অজেয় শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সামরিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, উত্তর কোরিয়া ঐতিহাসিকভাবে তাদের পদাতিক বাহিনী ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর বেশি জোর দিলেও, সাম্প্রতিক সময়ে নৌবাহিনীকে আধুনিকীকরণের এই পদক্ষেপ তাদের রণকৌশলের একটি বড় পরিবর্তন নির্দেশ করে।
সমুদ্রপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে জলে ও স্থলে সমানভাবে কার্যকর করার লক্ষ্যেই পিয়ংইয়ং এমন বিশাল বাজেটের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী এবং পারমাণবিক সাবমেরিনগুলো যখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিয়মিত টহল দিচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে উত্তর কোরিয়ার দশ হাজার টনের ক্রুজার যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের ঘোষণা একটি পরিষ্কার ভূরাজনৈতিক বার্তা।
কিম জং উনের এই ঘোষণার পর দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবে বলে মত দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তাদের মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা পদক্ষেপের কথা বলে আসলেও, কোরীয় উপদ্বীপের সামরিক উত্তেজনা দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি, রয়টার্স এবং ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বারবার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানানো হলেও, উত্তর কোরিয়া আত্মরক্ষার যুক্তিতে নিজেদের সামরিক সম্প্রসারণের পথেই অটল রয়েছে।