শুক্রবার, জুন ২৬, ২০২৬
১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
কোরীয় উপদ্বীপে চরম উত্তেজনা

পিয়ংইয়ংয়ের বৃহৎ অস্ত্র পরীক্ষার জবাবে সিউলের ড্রোন বাহিনী গঠনের উদ্যোগ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ জুন, ২০২৬, ০৫:২২ পিএম

পিয়ংইয়ংয়ের বৃহৎ অস্ত্র পরীক্ষার জবাবে সিউলের ড্রোন বাহিনী গঠনের উদ্যোগ
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে কোরীয় উপদ্বীপ বরাবরই এক চরম উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। সম্প্রতি এই অঞ্চলে সেই সামরিক উত্তাপ আরও এক ধাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চলমান তীব্র উত্তেজনার মাঝেই নিজেদের সামরিক সক্ষমতাকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে এক বিশাল ও সুদূরপ্রসারী অস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে উত্তর কোরিয়া।

 

মূলত নিজেদের দক্ষিণ সীমান্তকে সামরিকভাবে আরও সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য করার সুনির্দিষ্ট কৌশলগত উদ্দেশ্যেই পিয়ংইয়ং এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে বসে নেই সিউলও। উত্তর কোরিয়ার এই পেশি প্রদর্শনের তাৎক্ষণিক জবাবে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও আধুনিক এক পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।

 

শুক্রবার, ২৬ জুন, কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিস্তারিত ও তথ্যবহুল প্রতিবেদন থেকে কোরীয় উপদ্বীপের এই উদ্বেগজনক সমীকরণের কথা জানা গেছে। আল জাজিরার ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন গত বৃহস্পতিবার অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এই সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ করেন।

 

সামরিক মহড়া চলাকালে তিনি নিজের দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে যেকোনো পরিস্থিতিতে শত্রুর ওপর সর্বাত্মক ও ধ্বংসাত্মক আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণের জন্য পূর্ণাঙ্গরূপে প্রস্তুত থাকার কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন।

 

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ-এর বরাত দিয়ে জানা যায়, সর্বোচ্চ নেতা কিম তাঁর সামরিক বাহিনীকে এমন এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন, যা শত্রুদের সবসময় চরম অস্বস্তি ও মানসিক ভয়ের মধ্যে রাখবে।

 

তাঁর মতে, শত্রুপক্ষকে ভয়ের মধ্যে রাখাই হলো সম্ভাব্য যুদ্ধ প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান ও কার্যকর কৌশল। এই সুকৌশলী পদক্ষেপের ফলে শত্রুরা পিয়ংইয়ংয়ের ওপর কোনো ধরনের আক্রমণের দুঃসাহস দেখাতে পারবে না।

 

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার এবারের এই সমরাস্ত্র পরীক্ষায় বেশ কিছু অত্যাধুনিক ও ভয়ংকর মারণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘বিশেষ মিশন’ বা বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য তৈরি করা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেড, দূরপাল্লার একটি আধুনিক রকেট লঞ্চার এবং একটি স্বয়ংক্রিয় কামান ব্যবস্থা।

 

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, এই সর্বাধুনিক ওয়ারহেডগুলোর মূল লক্ষ্যবস্তু হলো শত্রুপক্ষের বিমানঘাঁটি, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোতে অত্যন্ত নির্ভুল ও প্রাণঘাতী আঘাত হানা।

 

কিম জং উন তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, পিয়ংইয়ং বর্তমানে তাদের নিজস্ব অস্ত্র কর্মসূচির নিখুঁততা এবং কার্যক্ষমতার পরিধিকে আরও বহুগুণে বৃদ্ধি করার জন্য নিরলসভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

সাম্প্রতিক এই সফল অস্ত্র পরীক্ষার মাধ্যমে মূলত দক্ষিণ সীমান্তে যেকোনো ধরনের ভয়াবহ গোলাবর্ষণ বা সুনির্দিষ্ট আক্রমণ পরিচালনার ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

 

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ক আলোচনা থমকে যাওয়ার পর থেকেই পিয়ংইয়ং নিজেদের সামরিক শক্তি এবং সমরাস্ত্রের ভাণ্ডার বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে আসছে।

 

এমনকি চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে কিম জং উন স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, খুব শিগগিরই উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনীর বহরে আরও অত্যাধুনিক পারমাণবিক অস্ত্র এবং বিশালাকারের যুদ্ধজাহাজ যুক্ত করা হবে।

 

এসব আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দেশটিকে যেকোনো ধরনের ‘বহুমুখী ও কার্যকর’ সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য সর্বদা প্রস্তুত রাখবে। এদিকে, উত্তর কোরিয়ার এই ক্রমবর্ধমান ও লাগামহীন সামরিক তৎপরতা জোরদারের ঘটনায় প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়ার ভেতরে গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

এমন একটি অস্থিতিশীল ও হুমকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সিউল তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও জোরালো, প্রত্যক্ষ ও কার্যকর সামরিক সমর্থনের আশা করছে। বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার ভূখণ্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেখানে প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ সুপ্রশিক্ষিত মার্কিন সেনা স্থায়ীভাবে মোতায়েন রয়েছেন।

 

গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ুং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন যে, মার্কিন নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পও মনে করেন উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়ার সময় এসেছে।

 

উত্তর কোরিয়ার এই অব্যাহত সামরিক চোখ রাঙানির বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়াও নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে সাজাচ্ছে। শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় জানিয়েছে যে, উত্তর কোরিয়ার দিক থেকে আসা ক্রমবর্ধমান সামরিক হুমকির কার্যকর ও আধুনিক জবাব দিতে তারা সামরিক বাহিনীতে ড্রোনের সংখ্যা এবং এর কার্যপাল্লা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

 

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-ব্যাক এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে জানান যে, তাদের সামরিক বাহিনী প্রায় ৫ লাখ সদস্যের এক বিশাল ‘ড্রোন যোদ্ধা’ বাহিনী গড়ে তোলার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করছে।

 

ভবিষ্যৎ যুদ্ধের আধুনিক রূপরেখা বিবেচনায় নিয়ে এই ড্রোনগুলো এমনভাবে সামরিক ব্যবস্থায় যুক্ত করা হবে, যা প্রশিক্ষিত সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের মতোই অত্যন্ত সহজে ও নিখুঁতভাবে ব্যবহার করতে পারবেন। কোরীয় উপদ্বীপের এই পাল্টাপাল্টি সামরিক প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এক নতুন ও ভয়াবহ সামরিক প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

- আল জাজিরা