আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বাহরাইনে অনুষ্ঠিত উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই কড়া বার্তা দেন।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, মার্কিন প্রশাসন ইরানের সঙ্গে একটি টেকসই সমঝোতা বা চুক্তি গঠনে আগ্রহী হলেও তা কোনো অবস্থাতেই নিজেদের শর্ত ও আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তাকে বিসর্জন দিয়ে করা হবে না।
ওয়াশিংটন এমন কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করবে না যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সার্বভৌমত্বকে বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের ঠিক আগেই মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় উপনীত হয়েছিল।
এই যুগান্তকারী প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্তমানে ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালিতে বৈশ্বিক জ্বালানি পণ্যের অবাধ পরিবহন নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে নিবিড় আলোচনা চলমান রয়েছে।
তবে তেহরানের দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সক্রিয় তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি বা সশস্ত্র মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি অব্যাহত সমর্থনের বিষয়টি এই সমঝোতার আলোচনায় চূড়ান্তভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, তা নিয়ে এখনো আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট ধোঁয়াশা ও অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
এই বিষয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক শেষে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। ওই বিবৃতিতে তাঁরা অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী, টেকসই শান্তি ও সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর নানাবিধ তৎপরতার একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান অত্যন্ত জরুরি।
এমন এক উত্তেজনাকর কূটনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালির ওমান উপকূলের কাছে একটি পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিষয়ক সংস্থা ইউকেএমটিও এই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে, হামলায় জাহাজটির প্রধান নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বা ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সৌভাগ্যবশত কোনো ধরনের প্রাণহানি বা পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেনি।
তবে এই আকস্মিক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)। সংস্থার মহাসচিব আরসেনিও ডোমিঙ্গেজ বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পুনর্মূল্যায়নের স্বার্থে ওই অঞ্চলে যুদ্ধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে আটকে পড়া প্রায় ৬০০ বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সার্বিক নিরাপত্তাহীনতাকে আরও একবার বিশ্বমঞ্চে প্রকটভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক নৌপথের এই সার্বিক নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার গুরুত্ব পুনরুল্লেখ করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন যে, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং এর ওপর এককভাবে কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কিংবা যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর ফি আরোপ করার কোনো আইনগত অধিকার নেই।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এই ধরনের বৈশ্বিক জলপথ কোনো একক জাতি-রাষ্ট্রের নিজস্ব সম্পত্তি বা ভূখণ্ড হতে পারে না। এই সর্বজনীন নীতি যদি কোনো রাষ্ট্র ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে, তবে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এক চরম বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয় নেমে আসবে।
জিসিসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও তাঁদের যৌথ বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালিতে সম্পূর্ণ নিঃশর্ত ও বাধাহীনভাবে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল সচল রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন। অবশ্য ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি এই প্রসঙ্গে কিছুটা নরম সুর বজায় রেখে বলেছেন যে, হরমুজ প্রণালির জন্য বর্তমানে যে আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে, তাতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর সরাসরি কোনো ট্রানজিট ফি আরোপের বিষয় অন্তর্ভুক্ত নেই।
তবে তিনি স্বীকার করেন যে, ইতিপূর্বে ওমান ও ইরান যৌথভাবে এই প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে প্রদত্ত বিভিন্ন বিশেষ সেবার বিপরীতে একটি সম্ভাব্য চার্জ বা ফি আদায়ের বিষয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করেছিল।
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে দীর্ঘ আলোচনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার অধীনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে আগামী ৬০ দিনের জন্য সম্পূর্ণ বিনা খরচে এবং কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করার একটি অন্তর্বর্তীকালীন সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তবে এই নির্ধারিত দুই মাসের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর ওই আন্তর্জাতিক জলপথে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ঠিক কী ধরনের আইনি বা আর্থিক ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে, সে সম্পর্কে কোনো পক্ষ থেকেই এখনো পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি।
ফলে এই ৬০ দিন পর বিশ্ব বাণিজ্যের এই অন্যতম প্রধান ধমনীটির নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে এক ধরনের গভীর অনিশ্চয়তা বা ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ বিরাজ করছে।