শনিবার, জুন ২৭, ২০২৬
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের মানবিকতা

মঞ্চ থেকে নেমে অন্তঃসত্ত্বা নারীর হাতে তুলে দিলেন নিয়োগপত্র

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুন, ২০২৬, ০৬:২৯ পিএম

মঞ্চ থেকে নেমে অন্তঃসত্ত্বা নারীর হাতে তুলে দিলেন নিয়োগপত্র
ছবি : Collected

ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয় সম্প্রতি এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক প্রশংসার পাত্রে পরিণত হয়েছেন। প্রশাসনিক রীতিনীতি ও কঠোর আনুষ্ঠানিকতার তোয়াক্কা না করে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর সুবিধার্থে তিনি যে সহমর্মিতার পরিচয় দিয়েছেন, তা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত বিরল এক ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

 

সম্প্রতি রাজ্যের রাজধানী চেন্নাইয়ে আয়োজিত একটি সরকারি অনুষ্ঠানে উঁচু মঞ্চ থেকে স্বয়ং নিচে নেমে এসে ওই নারীর হাতে সরাসরি চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আবেগঘন মুহূর্তের দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছেন এই জননেতা।

 

সাধারণ মানুষের প্রতি তার এই আন্তরিক ও সংবেদনশীল আচরণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোরও বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পঁচিশে জুন, বৃহস্পতিবার, চেন্নাই শহরের একটি সুসজ্জিত মিলনায়তনে রাজ্য সরকারের বিদ্যুৎ দপ্তরের নবনিযুক্ত কর্মীদের মাঝে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগপত্র বিতরণের এক বৃহৎ আয়োজন করা হয়েছিল।

 

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ এই সরকারি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যটির সরকারি কর্ম কমিশনের অত্যন্ত কঠোর ও স্বচ্ছ বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উত্তীর্ণ মোট চারশো এক জন যোগ্য প্রার্থীর হাতে ওই দিন নিয়োগপত্র তুলে দেওয়ার কথা ছিল।

 

এই নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে তিনশো তিরাশি জন ছিলেন সহকারী প্রকৌশলী এবং বাকি আঠারো জন ছিলেন সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা। পুরো অনুষ্ঠানটি যখন একটি সুনির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে অত্যন্ত শৃঙ্খলার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ঘটে এক অভাবনীয় ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনা, যা উপস্থিত সকলের মনোযোগ কেড়ে নেয়।

 

নিয়োগপত্র বিতরণের একপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যখন মঞ্চ থেকে পর্যায়ক্রমে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করছিলেন, তখন অক্ষয়া লক্ষ্মী নামের এক নারী প্রার্থীর নাম ডাকা হয়। জানা যায়, অক্ষয়া লক্ষ্মী সেই সময় গর্ভাবস্থার একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে অবস্থান করছিলেন, যার কারণে শারীরিকভাবে তার জন্য স্বাভাবিক হাঁটাচলা করাও ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।

 

নাম ঘোষণার পর তিনি যখন ধীর পায়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন বিষয়টি মঞ্চে উপবিষ্ট মুখ্যমন্ত্রীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ায়নি। তিনি খুব দ্রুত অনুধাবন করতে পারেন যে, এই জটিল শারীরিক অবস্থায় সিঁড়ি বেয়ে উঁচু মঞ্চে ওঠা ওই অন্তঃসত্ত্বা নারীর জন্য কেবল কষ্টকরই নয়, বরং মা ও সন্তান উভয়ের জন্যই বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

 

সাধারণত এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের সরকারি অনুষ্ঠানে বিশেষ কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে পদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী বিজয় কোনো রক্ষী বা প্রশাসনিক কর্মীদের সাহায্যের অপেক্ষা করেননি। তিনি প্রথাগত রীতিনীতি ভেঙে নিজেই একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

 

উপস্থিত শত শত দর্শক, পদস্থ কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সম্পূর্ণ বিস্মিত করে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি মঞ্চ থেকে নিচে নেমে আসেন। তিনি ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে যান দর্শকসারিতে বসে থাকা সেই অন্তঃসত্ত্বা নারী অক্ষয়া লক্ষ্মীর নির্ধারিত আসনের দিকে।

 

একেবারে তার সামনে গিয়ে অত্যন্ত বিনয় ও আন্তরিকতার সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং তার হাতে কাঙ্ক্ষিত সেই সরকারি চাকরির নিয়োগপত্রটি পরম যত্নে তুলে দেন। বিষয়টি কেবল একটি সাধারণ নিয়োগপত্র হস্তান্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অত্যন্ত সংবেদনশীল একজন অভিভাবকের মতো তিনি ওই নারীর সঙ্গে কিছুক্ষণ কুশল বিনিময়ও করেন।

 

সরকারি চাকরিতে যোগদানের মাধ্যমে জীবনের এই নতুন অধ্যায় শুরু করার জন্য তাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি তার অনাগত সন্তানের সুস্থতা এবং নিরাপদ প্রসবের জন্য আন্তরিক শুভকামনা জ্ঞাপন করেন তিনি।

 

মুখ্যমন্ত্রীর এমন অভাবনীয় মানবিক আচরণে মুহূর্তের মধ্যেই পুরো অনুষ্ঠানস্থল আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে এবং উপস্থিত সকলেই আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে স্বতঃস্ফূর্ত করতালির মাধ্যমে এই মহানুভবতাকে সম্মান প্রদর্শন করেন।

 

আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এমন একটি সুন্দর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ঘটনার ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য মানুষ মুখ্যমন্ত্রীর এই পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করে ইতিবাচক মন্তব্য করতে থাকেন।

 

সাধারণ নাগরিকদের অনেকেই তাদের প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখ করেছেন যে, একজন প্রকৃত জননেতার প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো সাধারণ মানুষের সুবিধা-অসুবিধাকে সবার আগে মূল্যায়ন করা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রথাগত গণ্ডি পেরিয়ে একজন সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের প্রতি রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষ ব্যক্তির এই যে অগাধ সংবেদনশীলতা, তা যেকোনো সুস্থ সমাজ ব্যবস্থায় অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

 

ক্ষমতা বা পদমর্যাদার অহংকার নয়, বরং মানবিক দায়িত্ববোধই যে একজন মানুষের শ্রেষ্ঠ পরিচয়, মুখ্যমন্ত্রী বিজয় তার এই কাজের মাধ্যমে তা সুনিপুণভাবে প্রমাণ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সি জোসেফ বিজয় সাধারণ মানুষের অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছানোর নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

তিনি সবসময় তার কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, সরকার ও জনগণের মধ্যে কোনো কৃত্রিম দেয়াল থাকা উচিত নয়। প্রশাসনকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং যেকোনো প্রয়োজনে জনগণকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করাই তার রাজনৈতিক লক্ষ্যের একটি অন্যতম প্রধান অংশ।

 

অক্ষয়া লক্ষ্মীর প্রতি তার এই মানবিক আচরণ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি তার সেই বৃহত্তর প্রশাসনিক দর্শনেরই একটি বাস্তব প্রতিফলন। এই ঘটনার মাধ্যমে তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতাই নন, বরং একজন দায়িত্বশীল, মানবিক ও সহানুভূতিশীল অভিভাবক হিসেবে নিজেকে সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন, যা আগামী দিনের রাজনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

 

এমএসএন